বিদেশে বসেই হামলার ছক কষে সন্ত্রাসীরা

পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

রাজধানীর পল্লবী থানার ভেতরে বোমা বিস্টেম্ফারণ ও অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনার নেপথ্যে অনেক রহস্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, বিদেশে পলাতক চার সন্ত্রাসী একজোট হয়ে পল্লবীর একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আরেক যুবলীগ নেতাকে হত্যার ছক কষেছিল। মিশন সফল করতে তারাই কিলার ভাড়া করে। এখন পর্যন্ত পল্লবীর ঘটনার তদন্তে যে ক্লু বেরিয়ে আসছে তাতে দেখা যায়, কাউন্সিলর অথবা যুবলীগ নেতাকে হত্যা করতেই এত বড় আয়োজন ছিল। তবে ওজন মাপার মেশিনের আড়ালে বোমা তৈরির বিষয়টি নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন রয়েছে। ভাড়াটে কিলারদের হাতে এ ধরনের বোমা কীভাবে এলো তা নিয়ে চলছে বিশদ অনুসন্ধান। বোমার ক্লু এখনও অজানা। তবে হামলার পেছনের মোটিভ স্থানীয় রাজনৈতিক ও চাঁদাবাজকেন্দ্রিক বিরোধ বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। তাদের দাবি, এ ঘটনায় জঙ্গি সংশ্নিষ্টতা নেই। পুলিশ ও স্থানীয় অন্যান্য সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কয়েক দিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিশানায় ছিলেন দাবি করে পল্লবীর একজন কাউন্সিলর সমকালকে জানান, কিছু দিন ধরেই নানা সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল, মিরপুরে কোনো একজন নেতার লাশ পড়বে। এটা জানার পর বিষয়টি তিনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অবহিত করেন। ভয়ে এখনও খুব প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে যান না তিনি। কোথাও গেলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিয়ে চলেন। প্রথমে তারা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না কাকে টার্গেট করা হয়েছে। পরে নানা সূত্র থেকে দু'জনের নাম জানতে পারেন। টার্গেট করা দু'জনই যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট। পরে মোটামুটি নিশ্চিত হন তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে অপর একটি সূত্র বলছে, দু'জনের মধ্যে কাকে হত্যার ছক চূড়ান্ত হচ্ছিল তা নিয়ে এখনও সন্দেহাতীত তথ্য মেলেনি। তবে একজনকে হত্যার সব আয়োজন ছিল এটা নিশ্চিত। এমন পরিকল্পনার পেছনে কারা লাভবান হতেন সেটা নিয়েও চলছে অনুসন্ধান।
গোয়েন্দা সূত্র ও এলাকার একাধিক রাজনীতিক সমকালকে জানান, মিরপুরে কিছু দিন ধরেই ব্যাপক হারে নীরব চাঁদাবাজি চলছে। ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে বিভিন্ন গ্রুপ চাঁদা দাবি করে আসছে। চাঁদা না দিলে নানা ধরনের ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। বিশেষ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত, জামিল, মামুন ও ইব্রাহিম গ্রুপ বেশ সক্রিয়। বহুদিন ধরেই তারা বিদেশে রয়েছে। অধিকাংশ সময় প্রত্যেকের গ্রুপ আলাদাভাবে চাঁদা তুলত।
একটি সূত্র বলছে, সম্প্রতি মিরপুরকেন্দ্রিক চারটি গ্রুপই একত্রিত হয়ে যায়। চার গ্রুপই একত্রিত হয়ে একজন কাউন্সিলর ও একজন যুবলীগ নেতাকে হত্যার ছক কষেছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে প্রায় একই ধরনের তথ্য দিচ্ছে গ্রেপ্তারদের মধ্যে দু'জন।
জানা গেছে, মিরপুরকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী গ্রুপের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন জামিল ও তার ভাই মামুন ওরফে কালা মামুন। ধারণা করা হয়, মামুন ভারতে ও জামিল নেপালে পলাতক। দু'জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে অনেক মামলা রয়েছে। মামুন চাঁদা দাবি করে নানাজনকে ফোন করে আর তার ছোট ভাই জামিল টাকা তোলে। তাদের আরেক ভাই মশিউর গাজীপুরের আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আসামি।
১৪ দিনের রিমান্ড :পল্লবী থানায় বিস্টেম্ফারণের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। পল্লবী থানার অস্ত্র ও বিস্টেম্ফারক আইনের দুই মামলায় পুলিশের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে মহানগর হাকিম মঈনুল ইসলাম এই আদেশ দেন। পুলিশ দাবি করছে গ্রেপ্তার রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোশাররফকে বুধবার ভোরে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল তাদের আদালতে হাজির করে পল্লবী থানার অস্ত্র মামলায় সাত এবং বিস্টেম্ফারক মামলায় দশ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফারুকুজ্জামান মল্লিক।
রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কমকর্তা এসআই সেলিম হোসেন শুনানিতে বলেন, 'এরা পেশাদার অপরাধী। তাদের নামে আরও মামলা রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের রিমান্ডে পাঠানো হোক।'
অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন আইনজীবী শামীমুল ইসলাম এবং ওয়াজেদ আলী। শুনানিতে তারা বলেন, এই আসামিদের সবাইকে 'অনেক আগে' গ্রেপ্তার করা হলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে পাঠানো হয়নি। এটা ফৌজদারি কার্যবিধি এবং সংবিধানবিরোধী। আসামিরা 'আহত' এবং রিমান্ডে পেলে পুলিশ তাদের ওপর 'অত্যাচার' করবে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন আসামি পক্ষের একজন আইনজীবী।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বিদেশে পলাতক এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে গ্রেপ্তার দু'জনের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তার মাধ্যমে এই অপারেশনে যুক্ত হন তারা। তবে অন্য একজন এই পরিকল্পনার সঙ্গে তার সংশ্নিষ্টতার কথা অস্বীকার করে আসছে।
পুলিশের ভাষ্য :পল্লবীর ঘটনায় কোনো জঙ্গি সংশ্নিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় পল্লবী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে আমরা যা পাচ্ছি এটা স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার সংশ্নিষ্ট একটি অপরাধমূলক কাজ। তারা কেন, কাকে, কীভাবে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। এর বেশি কিছু পেলে আমরা পরে জানাব।
পল্লবী থেকে গ্রেপ্তার তিনজনের একজন শহীদুল। তাকে তিন দিন আগে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করছে তার পরিবার। এ বিষয়ে থানায় জিডি আছে। তারপরও তাকে কীভাবে আগের রাতে গ্রেপ্তার করা হলো? এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আব্দুল বাতেন বলেন, 'এ বক্তব্য আমরা তদন্ত করে দেখব। আমরা এ ধরনের কোনো তথ্য পাইনি। আমরা তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছি।'
বুধবার ভোরে পল্লবী থানার ভেতর প্রচণ্ড বিস্টেম্ফারণে পুলিশের চার সদস্যসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রিয়াজুল ইসলাম নামে এক বেসামরিক ব্যক্তির অবস্থা গুরুতর। তার বাঁ হাতের কব্জি ও ডান হাতের একটি আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। অনলাইনে জঙ্গি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপ বুধবার রাতে তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে সাইট ইন্টিলিজেন্সের দায় স্বীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ দায় স্বীকারকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলছে পুলিশ।