প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক সদস্য এ কে এম এনায়েত উল্লাহ রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত তার বাড়ি ভাড়া দেওয়ার নোটিশ দিয়েছিলেন। 'রিচি ইন্টারন্যাশনাল' নামে কথিত একটি কোম্পানির পক্ষে বাড়ি ভাড়া নিতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। চুক্তিপত্র করতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিকুঞ্জ-২-এ অবস্থিত অফিসে যান। সেখানে দেখতে পান ব্রিফকেস ভরা 'কোটি কোটি' টাকা নিয়ে বসে আছেন অফিসের কর্তারা। বাড়ি ভাড়ার চুক্তি নিয়ে কথা বলার ফাঁকে তাকে তাদের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়। সকালে ওই ঘটনার পর সাবেক ওই সরকারি কর্মকর্তা বিকেলে সেখানে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। ওই দিনই লভ্যাংশ পেয়েও যান তিনি। এরপর সেই প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। তাতে তিনি ১৫ কোটি টাকার 'লভ্যাংশ' পান। সেই লাভের টাকা নিতে গিয়ে দেখেন অফিসটিই বন্ধ! পরে তিনি বুঝতে পারেন প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন। শুধু সাবেক ওই সরকারি কর্মকর্তাই নন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অনেক ব্যবসায়ীও বেশি লাভের আশায় এমন কথিত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের নামে প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে কোটি কোটি টাকা খুইয়েছেন। পুলিশের খাতায় এই প্রতারক চক্রের নাম 'রয়্যাল চিটিং ডিপার্টমেন্ট', সংক্ষেপে আরসিডি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আরসিডি চক্রের সদস্যরা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে অতি সুসজ্জিত অফিস গড়ে তোলে। এরপর নানা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে সাইনবোর্ড লাগায়। চক্রের সদস্যদের চলাফেরা, কথা বলার ধরনেও রাজকীয় ভাব থাকে। সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতীয় বড় ব্যবসায়ী বা দেশে বিনিয়োগকারী পরিচয় দিয়ে থাকে। তারা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা যাদের অলস টাকা পড়ে থাকে তাদের জন্য নানা ফাঁদ পাতে।
ভুক্তভোগী এ কে এম এনায়েত উল্লাহ সমকালকে বলেন, তিনি নিকুঞ্জের অফিসটিতে গিয়ে বুঝতেই পারেননি এটি কোনো প্রতারক চক্রের অফিস হতে পারে। সেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছিল। সব হারিয়ে বুঝতে পারেন প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন। পরে তিনি গত ৫ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন।
ওই মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ তদন্ত করছে। ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, আরসিডির সদস্যরা রাজকীয় কায়দায় প্রতারণা করে আসছে। তারা রাজধানীর অভিজাত এক এলাকায় অফিস চালু করে প্রতারণার পর অন্য এলাকায় অফিস চালু করে ফের প্রতারণা শুরু করে। এ ধরনের একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক সদস্য এ কে এম এনায়েত উল্লাহর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া আরসিডি চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি জানায়, মাসুদ খান, আসাদুজ্জামান, নাজির শেখ, নাসিম শেখ, এমদাদ উল্লাহ ও নুরুল আমিন রতনকে গ্রেপ্তার করে আরসিডির প্রতারণা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। ওই চক্রের কবির মাহমুদ তালুকদার ওরফে সুলাইমান, লিটন মুন্সী ও শিমুল ওরফে আবদুর রহমান নামে তিনজন পলাতক রয়েছে।
ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির গুলশান জোনাল টিমের এডিসি গোলাম সাকলায়েন সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার চক্রের সদস্যদের মধ্যে মাসুদ খান নিজেকে ভারতীয় নাগরিক ও বড় ব্যবসায়ী পরিচয় দেয়। তারা ব্রিফকেসের ভেতরে কাগজ আর ইট ভরে ওপরে শুধু কিছু টাকা সাজিয়ে রেখে টার্গেট ব্যক্তির কাছে বিশ্বাস স্থাপন করে।
যেভাবে প্রতারণা করে আরসিডি :ডিবি কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েন বলেন, আরসিডি চক্রের সদস্যরা কয়েকটি গ্রুপে কাজ করে। প্রথম ধাপে তাদের স্থানীয় ব্রোকার থাকে। তারা নানাভাবে লোকজনকে টার্গেট করে। বিশেষ করে বিভিন্ন ক্লাব, বার, তারকা হোটেলে তাদের যাতায়াত থাকে। সখ্য গড়ে তারা বিনিয়োগের আহ্বান জানায়। তা ছাড়া কেউ বাড়ি ভাড়ার নোটিশ দিলে বা জমি বিক্রির নোটিশ দিলে তাদের পিছু নেয়। এভাবে নানা কৌশলে বিনিয়োগের কথা বলে তারা টার্গেট ব্যক্তিকে আরসিডি অফিসে নিয়ে যায়। এসব অফিসে কথিত বস, ম্যানেজার, কান্ট্রি ম্যানেজারসহ নানা পদের কর্মকর্তা থাকে।
ডিবির অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, যারা সাধারণত উচ্চাভিলাসী, লোভী বা যাদের তরল টাকা রয়েছে, তারা সহজেই এই চক্রের খপ্পরে পড়ে থাকেন।
আরসিডির প্রতারণার যত ধাপ :ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, বিনিয়োগ ছাড়াও এ চক্রটি টার্গেট ব্যক্তিদের জুয়া খেলায় উদ্বুদ্ধ করে থাকে। সাধারণত অভিজাত হোটেলে এই জুয়ার আয়োজন করা হয়। প্রথম দিকে টার্গেট ব্যক্তি জুয়ার আসর থেকে টাকা পেলেও পরে কৌশলে সব টাকাই হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। এ ছাড়া আরসিডির সদস্যরা জমি, কঙ্কাল, কয়েন, মূর্তি, ম্যাগনেট পিলার, সাপের বিষ, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, পাথরের ব্যবসা এবং তক্ষক ক্রয়-বিক্রয়ের নামেও প্রতারণা করে আসছে। এর বাইরে তারা নানা অভিনব প্রতারণা করে থাকে।
সক্রিয় যারা :বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া আরসিডি চক্রের দেওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে রয়্যাল চিটিং গ্রুপের অন্তত অর্ধশত চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে উত্তরা এলাকায় জাহাঙ্গীর ওরফে ব্রিফকেস জাহাঙ্গীর, জুয়েল, সুলাইমান, গুলশান-বনানী এলাকায় শহীদের গ্রুপ, মোহাম্মদপুর-মিরপুর এলাকায় মহসিন, হোসেন আলী মাতবর, মোয়াজ্জেম, রফিকুল ও নাসির, রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় রহিম সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া ভাসমান অবস্থায় আবদুল করিম ও জীবন জাহিদ, কয়েন প্রতারক নান্নু মিয়া, ম্যাগনেট প্রতারক দেবদাস, সাজিদুর রহমান সুজন, আনোয়ার মুন্সি, পিলার প্রতারক আবদুন নুর, কুদ্দুস, আনছার, কাশেম, শাহিদ মিয়া, আহমদ, বাচ্চু হাওলাদার, মূর্তি প্রতারক শাহজাহান, আবদুর রহিম, হালিম, নাজমুল হক, মনীন্দ্র চন্দ্র, সাপের বিষ প্রতারক আবু হানিফ ওরফে হানিফ চেয়ারম্যান, নজরুল ইসলাম, আফছার আলী, রইচ উদ্দিন, মোক্তার এবং তক্ষক প্রতারক ওয়াহিদুজ্জামান ও কামরুল ইসলামের নাম তালিকায় রয়েছে।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা একেকটি প্রতারণা সফল করতে পারলে নতুন নাম ধারণ করে নতুন প্রতারণা শুরু করে।

বিষয় : 'রয়্যাল চিটিং ডিপার্টমেন্ট'

মন্তব্য করুন