সাংবাদিকতার সোপান নির্মাণে প্রায়ত সাংবাদিকরা ছিলেন পথিকৃৎ। পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তাদের অনেকেই কর্মময় জীবনকে অমরত্ব দিয়েছেন। আমাদেরকে তাদের দেখানো পথ অনুসরণ করতে হবে।

রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে করোনাকালে প্রয়াত ১৮ সদস্য সাংবাদিকদের স্মরণে আয়োজিত সভায় সহকর্মী ও শুভান্যুধায়ীরা এসব কথা বলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাব ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে এই সভার আয়োজন করে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বরাবরই ক্লাব প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়। তবে এবার করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে নন্দিত কথা সাহিত্যিক রাহাত খান, মেধাবী ছাত্রনেতা ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, কবি মাশুক চৌধুরী ও 'গেদুচাচা' খ্যাত খোন্দকার মোজাম্মেল হকসহ ১৮ জন স্বনামধন্য সাংবাদিককে গত এক বছরে হারিয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব।

করোনা মহামারির কারণে এবার সেই প্রয়াত সাংবাদিকদের স্মরণে উৎসব-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে ব্যাতিক্রমী এই স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ১৭ জনের জানাজা করানোর কারণে রেওয়াজ অনুযায়ী ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই স্মরণ সভায় শ্রদ্ধা জানাতে রোববার প্রয়াত সাংবাদিকদের সহকর্মী ও শুভ্যানুধায়ীদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। প্রয়াত সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের অবেগঘন স্মৃতিচারণে উপস্থিত সহকর্মীরা এক পর্যায়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন।

প্রয়াত ১৮ সাংবাদিক হলেন-ডিপি বড়ূয়া (দেবপ্রিয় বড়ূয়া), রাহাত খান, নুরুদ্দিন ভুইয়া, ফেরদৌস আহমেদ কৌরশী, আবু জাফর পান্না, ফজলুন নাজিমা খানম, কবি মুশাররাফ করিম, কাজী মো.শামসুল হুদা, কবি মাশুক চৌধুরী, আবদুল্লাহ এম হাসান, রওশন উজ জামান, ফারুক কাজী, আহসান হামিদ, খোন্দকার মোজাম্মেল হক, খোন্দকার মুহিতুল ইসলাম, রাশীদ উন নবী, আবদুস শহীদ ও আসলাম রহমান।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলমের সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ও অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি আজিজুল ইসলাম ভুইয়া, ওমর ফারুক, যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে মহাসচিব শাবান মাহমুদ।

এ ছাড়া মুক্ত আলোচনায় স্মৃতিচারণ করেন সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত, প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, স্বদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রতন, জিটিভির এডিটর ইন চীফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, নিউজ২৪ এর প্রধান বার্তা সম্পাদক রাহুল রাহা, দেলোয়ার হোসেন, শাহনাজ বেগম, কল্যান সাহা, সুবাস চন্দ্র বাদল, বখতিয়ার রানা প্রমুখ। সভা সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

সভায় প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খন্দকার মহিতুল ইসলাম রঞ্জুর সহধর্মিণী সাহিদা ইসলাম, ফারুক কাজীর সহধর্মিণী রাশিদা কাজী, রাহাত খানের সহধর্মিণী অর্পণা সেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। এ সময় উপস্থিত প্রয়াত সাংবাদিক পরিবারের কয়েকজনের হাতে ক্লাবের পক্ষ থেকে 'শোক বার্তা' তুলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রয়াত ১৮ জন সদস্যের সংক্ষিপ্ত জীবনীও প্রকাশ করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাব।

সভায় খন্দকার মহিতুল ইসলাম রঞ্জুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার সহধর্মিণী সাহিদা ইসলাম। তিনি বলেন, '১৯৮০ সালে বিয়ে হওয়ার পর থেকে তাকে দেখে এসেছি। সৎ জীবন যাপন করতেন, সংসার চালাতে কষ্ট হলে তাকে বলতাম তোমার চেয়ে অনেক জুনিয়রও গাড়ির চাবির রিং হাতে নিয়ে ঘোরায়। তিনি বলতেন, 'আমি বেতনের বাইরে কোনো টাকা নেই না। সততা আমার গর্ব। এ নিয়ে বেচে থাকতে চাই।' আমিও এটা নিয়ে সত্যিকারভাবে গর্ব করতাম।'

প্রয়াত ফারুক কাজীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার সহধর্মীণি রাশিদা কাজী। তিনি বলেন, ' তার সহজ সরল সৎ মন নিয়ে খুশী ছিলাম। তার সততাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, তার জন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন।'

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, 'মৃত্যুর পরে আমাদের কাছে তাদের আর কারও কোন প্রত্যাশা নেই, যেটি আছে সেটা হল তাদের স্মরণ করা, দোয়া করা। তাই প্রেস ক্লাব এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যে স্মরণ করছে তা অনন্য।'

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, কখনও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এমন স্মরণ সভার আয়োজন করতে হবে ভাবিনি, কিন্ত এবার আমরা মনে করেছি, করোনায় আমাদের অনেকেই চলে গেছেন, যাদের এভাবে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। করোনা পরিস্থিতিতে আমরা তাদের শেষ শ্রদ্ধ্যা জানাতে পর্যন্ত পারিনি। এটি আমাদের পীড়া দেয়।'

আজিজুল ইসলাম ভুইয়া বলেন, 'গেদু চাচাখ্যাত সাংবাদিক খোন্দকার মোজাম্মেল হকের সঙ্গে তখনও পরিচয় ছিল না, আশির দশকে আমরা চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা একবার অনশন করছিলাম, তখন তিনি সেখানে আসেন এবং পরে এ নিয়ে তার কলামে লেখেন। তার সেই লেখা ব্যাঙ্গাত্মক হওয়ায় এ নিয়ে আমরা হাসাহাসিও করছিলাম। অথচ তার লেখনীতে এতটা ধার ছিল যে, দুইদিন পর তখনকার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তথ্য মন্ত্রণালয়কে চট্রগ্রামের সাংবাদিকদের সমস্যা সমাধানে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সমাধানও হয়েছিল। প্রয়াত প্রায় প্রত্যেক সাংবাদিককে নিয়ে এমন কিছু বলা অসম্ভব নয়। যাদের আমরা হারিয়েছি তারা সবাই ছিলেন গণমাধ্যমের পথিকৃৎ।'

শাবান মাহমুদ বলেন, 'যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের আর কখনো প্রেস ক্লাবের আঙ্গিনায় দেখা যাবে না। তাদের আত্মার শান্তি কামনা ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।'

কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় তাদের শেষ বিদায়ে অংশ নিতে পারিনি। তাদের অনেকেই কর্মের মাধ্যমে আমাদের কাছে বেঁচে থাকবেন।'

সভাপতির বক্তব্যে সাইফুল আলম বলেন, 'প্রতিষ্ঠাবার্ষীকির আনন্দের চেয়ে যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের অনেক বেশি। কারণ যে পথ এই ১৮ জন প্রয়াত সাংবাদিক তৈরি করেছেন, সেই পথে আমরা এখন হাঁটছি, কেউ কেউ দৌড়াচ্ছেন, আমরা তাদের শ্রদ্ধ্যায় রাখতে চাই, স্মরণ করতে চাই। মরে গেলেও তারা তাদের কর্মে, ব্যবহারে আমাদের জীবনাচারে থেকে যাবেন। তাদের অনেকেই পেশাদারিত্বের প্রতি অবিচল ছিলেন। তাই তারা আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবেন।'