রাজধানীতে সন্ধ্যা নামতেই ছিনতাই

'ঝামেলা' এড়াতে থানা পুলিশ পর্যন্ত যাচ্ছেন না অনেক ভুক্তভোগী

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০   

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন শেষে রাজধানীর গ্রিন রোড দিয়ে বাসায় ফিরছিলেন মো. শাহীন নামে এক ব্যক্তি। তার রিকশা সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পৌঁছার আগেই একটি মোটরসাইকেলে তিন যুবক এসে পথরোধ করে। রামদা আকৃতির ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তার টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। গত ২ অক্টোবর মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। অপর ঘটনায় ১০ অক্টোবর রাতে খিলগাঁও গার্লস কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী কোচিং সেন্টার থেকে বাসায় ফিরছিলেন। বাড্ডার মেরাদিয়া এলাকার চিলড্রেন স্পেশাল স্কুলের সামনে ছুরি দেখিয়ে তার হাতব্যাগ ও আইফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার হাতে ছুরিকাঘাত করা হয়।

শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। ফলে রাতে অনিরাপদ হয়ে পড়ছে চলাচল। এদিকে, ছিনতাইয়ের শিকার হলেও 'ঝামেলা' এড়াতে অনেক ঘটনাতেই থানা পুলিশ পর্যন্ত যাচ্ছেন না ভুক্তভোগী। ফলে পুলিশের খাতায় থাকছে না ছিনতাইয়ের প্রকৃত সংখ্যা। কেউ কেউ দাবি করেন, পুলিশের কাছে অভিযোগ করে কোনো লাভ হয় না। অবশ্য অভিযোগ করার পর জড়িতরা ধরা পড়েছেন- এমন ঘটনাও কম নয়। বাড্ডার ঘটনাতেই দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন সমকালকে বলেন, ছিনতাই বেড়েছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তবে করোনাকালে বেকার হয়েছে অনেকে। টাকার প্রয়োজনে কেউ কেউ অন্যায় পথে পা বাড়িয়ে থাকতে পারে। বিচ্ছিন্নভাবে যে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে, সে সম্পর্কে পুলিশ অবহিত। প্রতিটি অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেই ছিনতাই ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। নিয়মিত নজরদারি ও টহল জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির শিথিলতার সুযোগে তৎপর হয়ে ওঠে অপরাধীরা। নতুন করে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়েছে অনেকে। তাদের সম্পর্কে পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত তথ্যও নেই। দেখা যায়, তারা কোনো বড় চক্রের সদস্য নয়। কখনও একা, কখনও দু-তিনজন মিলে অলিগলিতে রিকশা আরোহী বা পথচারীকে থামিয়ে টাকা-ফোন লুট করছে। ছিনতাইয়ে বাধা দিলে ছুরিকাঘাত বা গুলি করতেও দ্বিধা করছে না। ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে যাত্রাবাড়ীতে আক্তার হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। তিনি একটি বাস কাউন্টারের ম্যানেজার ছিলেন।

বাড্ডার ঘটনায় ভুক্তভোগী কলেজছাত্রীর বাবা মাহাবুব আলম সিদ্দিক মঞ্জু জানান, ১০ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে তার মেয়ে মেরাদিয়ায় ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়ে। ছুরিকাঘাত করে তার মেয়ের হাতে থাকা লেডিসব্যাগ ও আইফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ফরাজী হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম সমকালকে বলেন, ঘটনার চার দিন পর ১৪ অক্টোবর ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা পুলিশকে বিষয়টি জানান। পর দিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে শামীম ও রুবেল নামে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় লুণ্ঠিত আইফোন ও ছিনতাইয়ে ব্যবহূত ছুরি উদ্ধার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার দু'জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

এদিকে, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার শাহীন জানান, তার মানিব্যাগে খুব বেশি টাকা ছিল না। মোবাইল ফোনটির দামও বেশি নয়। এ কারণে তিনি মামলা করতে যাননি। তাছাড়া মামলা করে কোনো সুফল মিলবে বলে তার মনে হয়নি।

অবশ্য পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হলে অবশ্যই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানো উচিত। এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। লুণ্ঠিত জিনিস উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে।

আরও কিছু ছিনতাই :বংশালের স্টার বেকারি এলাকায় ২০ সেপ্টেম্বর রাতে শুক্কুর আলী নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর রাতে শেরেবাংলা নগরের বৌ-বাজার এলাকায় প্রাইভেটকারে আসা ছিনতাইকারীরা বিকাশ এজেন্টকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আট লাখ টাকা ও ফোন লুট করে। গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহপুর এলাকায় টানা পার্টির খপ্পরে পড়েন চাকরিজীবী টিটু আহমেদ। তিনি বাসে বসে কথা বলার সময় জানালা দিয়ে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর দু'দিন পর রাতে রামপুরা ব্রিজ এলাকায় গোলাম রসুল নামে রিকশা আরোহী এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার রিকশার গতিরোধ করে ফোনটি কেড়ে নেয়। তিনিও পুলিশের দ্বারস্থ হননি।