জাতীয় প্রেস ক্লাবের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সাংবাদিকরা। তারা বলেছেন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেস ক্লাব বার বার অগণতান্ত্রিকতা ও সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন মত প্রকাশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে 'জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬৬ বছর ও বাংলাদেশের সাংবাদিকতা' শীর্ষক সেমিনারে সাংবাদিকরা আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ এমন কোনো শীর্ষ রাজনীতিবিদ নেই যারা এই ক্লাবে একাধিকবার আসেননি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়েও রয়েছে প্রেস ক্লাবের অনন্য ভূমিকা। কিন্ত সময়ের পরিক্রমায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী হলেও সাংবাদিকতার মান এখন নিম্নমুখী।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। সেমিনার শেষে কেক কেটে সম্পন্ন করা হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক দু'জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব ও আমানউল্লাহ। আলোচনায় অংশ নেন প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুর রহমান এমপি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম হেলাল, বিএফইউজের (একাংশ) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, বিএফইউজের সভাপতি মোল্লা জালাল, প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ সভাপতি ওমর ফারুক, সহ-সভাপতি আজিজুল ইসলাম ভুইয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার সাহা, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব আবদুল জলিল ভুইয়া, ডিইউজের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, সাবেক সভাপতি কাজী রফিক, শফিকুল করিম সাবু, জাহিদুজ্জামান ফারুক, সোহরাব হাসান, আলমগীর মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, রাশেদ চৌধুরী, শাহেদ চৌধুরী, কল্যান সাহা, শাহনাজ বেগম, আশরাফ আলী, শাহনেওয়াজ, তরুন তপন চক্রবর্তী, মুফদি আহমেদ, মুনতাসিম বিল্লাহ ও পবিত্র কুণ্ডু। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

মূল প্রবন্ধে হারুন হাবীব বলেন, 'সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেদের অধিকতর যোগ্য করে তুলি, মহান পেশাকে মহিমান্বিত করি, এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বমর্যাদায় সামনে এগিয়ে নেই। আমরা যেন আদর্শিক হই, রাজনীতির সহনশীল সংস্কৃতি ধারণ করে সমাজকে উত্তরোত্তর প্রগতিশীলতার দিকে ধাবিত করি।'

আমানউল্লাহ বলেন,'আমরা সাংবাদিকরা পেশাগত কারণে রাজনীতি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করবো। তবে রাজনীতি বা দলীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যেনো আমরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে অসঙ্গত আচারণ না করি।' পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজে বিরাজমান অনৈক্যের অবসান ঘটিয়ে ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও করেন তিনি।

পরে মুল প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনায় শফিকুর রহমান এমপি বলেন, সংবাদপত্রের পরিসর বাড়লেও সাংবাদিকতার মান কিন্তু বাড়েনি। পত্রিকাগুলোতে এখন গল্প লেখা হচ্ছে। সাংবাদিকদের যোগ্যতার উত্তরণ ঘটাতে হবে। ভাল মানের সাংবাদিক হতে হলে প্রচুর বই পড়া এবং লেখাপড়া করতে হবে।

ইহসানুল করিম হেলাল করোনা সংক্রমন পরিস্থিতি প্রেস ক্লাব কমিটির কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, জাতীয় প্রেস ক্লাব বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীন বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উপত্যকার মত। সারা দেশে যখন স্বৈরতন্ত্রে নিমজ্জিত ছিল তখন এই প্রেস ক্লাবেই গনতন্ত্রের চর্চা হতো। আগে আমরা দেখতাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নড়বড়ে তবে শিক্ষা ছিল শক্তিশালী, এখন তার বিপরিত ঘটছে। একই অবস্থা সাংবাদিকতার, গণমাধ্যমের প্রসার ঘটলেও আগের সাংবাদিকতা বা নৈতিকতা নেই। তিনি আরও বলেন, আমাদের ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু প্রেস ক্লাবে গনতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকবে। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস রচনা এবং প্রতিষ্ঠা সদস্যদের পরিচিতি দৃষ্টিনন্দন জায়গায় উপস্থাপনের দুটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন।

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, 'দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে আমরা ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, শুধু স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল ও সমর্থকদের সঙ্গে আমাদের কোনো আপোষ নেই, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এটি আমরা করবও না।'

সভাপতির বক্তৃতায় সাইফুল আলম বলেন, জাতীয় প্রেসক্লাব বহু মত ও পথের মানুষের এক বহুলৌকিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতার আঁধার। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমচেতনার ধারক জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি বিশ্বাস এবং আস্থার নাম। গণমানুষের এই আস্থা আমাদের ধরে রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, আজকের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এইদিন যেমন আনন্দের তেমনি বেদনারও। গত এক বছরে জাতীয় প্রেসক্লাব ১৮ জন সদস্য হারিয়েছে। এই কারণে আমরা গত পরশুদিন স্মরণসভাও (রোববার) করেছি। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে এ ধরণের নজির নেই। তিনি এ সময় প্রেস ক্লাবের উন্নয়নের নানা ফিরিস্তিও তুলে ধরেন।