রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফাতেমা আক্তার নামে এক কথিত মনোরোগ চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানমন্ডি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হাসপাতালটির পরিচালক। এ নিয়ে ওই ঘটনায় মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এদিকে ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মৃত্যুঞ্জয় দে সজল সমকালকে বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের বক্তব্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাসপাতালটির পরিচালক ও কথিত মনোচিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার তাকে রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।\হতদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, রিমান্ডে থাকা আসামিরা এলোমেলো তথ্য দিচ্ছে। তারা একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের দাবি, হাসপাতালে আসা রোগীদের সমস্যার ধরন দেখে চিকিৎসা বলে দিতেন ফাতেমা আক্তার। প্রথম অবস্থায় সবাইকে মারধর করে দুর্বল করে ফেলা হতো। পরে বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে দেখানো হতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর চিকিৎসা পরামর্শ দিতেন ফাতেমা। তিনি মনোবিজ্ঞানে পড়েছেন এবং পরে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন। তবে তিনি ডিগ্রির কোনো সনদ দেখাতে পারেননি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে হত্যার পাশাপাশি অপচিকিৎসা তথা প্রতারণার মামলাও হতে পারে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের শেষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাদা অ্যাপ্রোন পরা নারীকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছে পুলিশ। শেষ মুহূর্তে ওই নারীকে আনিসুলের বুকে চাপ দিতে দেখা যায়। তিনি প্রকৃত চিকিৎসক কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি :আনিসুল হত্যার ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিটির প্রধান ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান সমকালকে বলেন, হাসপাতালে গিয়ে কথা বলার মতো কাউকে পাইনি। বেশিরভাগই গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। এ কারণে খুব ভালোভাবে ঘটনা জানার সুযোগ হয়নি। যতটুকু জানা গেছে, তা প্রতিবেদন আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখানে তদন্তের মূল অংশটাই পুলিশ করছে। আশা করা যায়, তারা সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবে।\হএদিকে মঙ্গলবার চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্য সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, পুলিশ কর্মকর্তাকে কারা ওই হাসপাতালে ভর্তি করল, এ ক্ষেত্রে কারও প্ররোচনা ছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে তিন দিনে হয়তো তদন্ত শেষ করা যাবে না। এজন্য সময় বাড়ানোর আবেদন জানানো হবে।
প্রতিবাদ :এএসপি আনিসুল করিম হত্যার প্রতিবাদ জনিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিসিএস অফিসার্স ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি মনোয়ার আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল আহাদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, চিকিৎসাসেবার নামে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার মৃত্যুতে দেশ সম্ভাবনাময় এক মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তাকে হারাল।
সোমবার রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালে বরিশাল মহানগর পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৩১তম বিসিএসে প্রথম স্থান অর্জন করা এই কর্মকর্তাকে খুনে অংশ নেয় ১০ জন। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে ১০ জন সাত দিনের রিমান্ডে রয়েছে। অসুস্থ থাকায় চিকিসাধীন রয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. নিয়াজ মোর্শেদ।
জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি :গাজীপুরের সন্তান ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুল করিম শিপন হত্যার ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছে গাজীপুর অফিসার্স ফোরাম, ঢাকা। বিবৃতিতে বলা হয়েছে- মাইন্ড এইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের নির্যাতনে আনিসুলের মৃত্যু হয়েছে, সিসি ক্যামেরার ফুটেজেই তা স্পষ্ট। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. আনিছুর রহমান মিঞা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।