রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে পুলিশের সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম ছাড়া আরও অনেক রোগীকেই নির্যাতন করা হতো। ওই হাসপাতালের কর্মীরা চিকিৎসার নামে আনিসুলকে নির্যাতন করে হত্যার পর এখন অনেক ভুক্তভোগী পরিবারই পুলিশের কাছে অভিযোগ দিচ্ছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আনিসুলকে হঠাৎ করে কেন ওই হাসপাতালে নেওয়া হলো- সে অনুসন্ধানও শুরু করেছে পুলিশ।\হএদিকে সাধারণ বিষয়ে পড়ালেখা করেই পরিচালকদের একজন হয়ে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক বনে গিয়েছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া ফাতেমা খাতুন ময়না। গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে আনিসুল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মাইন্ড এইড হাসপাতালের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ১০ জন আদাবর থানা পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।
পুলিশ ক্যাডারের ৩১ ব্যাচের মেধাবী কর্মকর্তা আনিসুল করিম বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার ডাক নাম শিপন। গত সোমবার সকালে স্বজনরা এই কর্মকর্তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেন। সেখান থেকে তাকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তির পর তাকে হাসপাতালের কর্মীরা ওয়াশরুমে নেওয়ার কথা বলে দোতলায় নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন, তাকে অন্য হাসপাতালে নিতে হবে। তবে সেখানে কর্মীদের সন্দেহজনক আচরণের পর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আনিসুলকে আট থেকে ১০ জন মিলে মারধর করছেন। পরে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক এই কর্মকর্তাকে মৃত ঘোষণা করেন।\হওই ঘটনায় আনিসুলের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি মৃত্যুঞ্জয় দে সজল সমকালকে বলেন, মাইন্ড এইডে শুধু আনিসুলকেই নির্যাতন করা হয়নি। আরও অনেককে এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার অনেক রোগীর স্বজন পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা পেলে তাদের আনিসুল হত্যা মামলার সাক্ষী করা হবে।\হপুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া এজাহারভুক্ত আসামি ফাতেমা খাতুন ময়না মাইন্ড এইড হাসপাতালের পরিচালকদের একজন। তিনি মনোবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স করেই হাসপাতালটিতে সাইকো থেরাপিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। যদিও তার সেই অনুমতি ছিল না। ওই আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকো থেরাপির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার দাবি করলেও এর স্বপক্ষে কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।\হপুলিশের তদন্ত সংশ্নিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা জানান, আনিসুল করিম গত সোমবার সকালে ঢাকায় আসার আগে বৃহস্পতিবার বরিশালে অফিস করেছেন। তিনি কীভাবে হঠাৎ করে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন- তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বিসিএস পুলিশের একজন কর্মকর্তাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে নেওয়া হলেও তাকে কোন পরিস্থিতিতে কারা কথিত মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠিয়েছিল- সে বিষয়েও তদন্ত চলছে।\হআনিসুল হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন :আনিসুল করিম হত্যার প্রতিবাদে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। তারা আনিসুল হত্যার প্রতিবাদের পাশাপাশি দ্রুত বিচারও দাবি করেছেন। অবিলম্বে সব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করা এবং আনিসুল হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা এসেছে ওই কর্মসূচি থেকে।\হআনিসুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মেহেদী জামিল বলেন, 'আমরা ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। হত্যার যে ভিডিও ফুটেজ আছে, তাতে লুকোচুরির জায়গা নেই। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেটা ন্যক্কারজনক।'\হজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য আশিস কুমার মজুমদার বলেন, 'আনিসুল কেন মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেন, তারও তদন্ত হওয়া দরকার।'