এএসপি আনিসুল হত্যা

মাইন্ড এইডের চিকিৎসা ছিল 'দালালনির্ভর'

ডা. মামুনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বিক্ষোভ ও পরিচালক অবরুদ্ধ

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালের চিকিৎসার প্রায় পুরোটা ছিল 'দালালনির্ভর'। সরকারি বিভিন্ন মেডিকেলের ডাক্তার, নার্সসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সদস্যরা কমিশনের ভিত্তিতে ওই হাসপাতালে রোগী পাঠাতেন। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সরকারি চিকিৎসক হয়ে যারা মাইন্ড এইডে মোটা কমিশনের জন্য সবচেয়ে বেশি রোগী পাঠিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দু'জন ডাক্তার। তারা হলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ডা. তারিক সুমন। গত মঙ্গলবার ডা. মামুনকে গ্রেপ্তার করে দু'দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিম শিপনকে নিজ হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে কমিশনের জন্য মাইন্ড এইডে পাঠিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার চার আসামির জবানবন্দি ও মোবাইল ফোনের রেকর্ডে মাইন্ড এইডের সঙ্গে তার সখ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে ডা. মামুনের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল
ও আজ দেশের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা তাদের প্রাইভেট চেম্বার ও অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি) বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সমকালকে বলেন, আসামিদের বক্তব্যে মাইন্ড এইডের সঙ্গে আরও কয়েকজন চিকিৎসকের কমিশন বাণিজ্যের তথ্য উঠে এসেছে। চিকিৎসার নামে যারা দিনের পর দিন মানুষকে হয়রানি করেছে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। হাসপাতালে সেবার নামে কেউ কেউ চরম অমানবিক আচরণ করছে। জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি চলতে দেওয়া যায় না।
ডিসি হারুন অর রশিদ আরও বলেন, মাইন্ড এইডের চিকিৎসা ছিল পুরোটাই দালাল আর কমিশননির্ভর। এরই মধ্যে অন্তত ২৫ জন দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও অনেককে খোঁজা হচ্ছে।
এদিকে পিটিয়ে পুলিশ হত্যার মামলায় আসামি ড. মামুনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গতকাল জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালককে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিক্ষোভের কারণে বুধবার সকাল ১০টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সব ধরনের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ ছিল ওই হাসপাতালে। আউটডোর, টিকিট কাউন্টারও ছিল বন্ধ। এতে অসংখ্য রোগী ভোগান্তির শিকার হন।
মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আন্দোলনরত চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, ডা. মামুনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন থেকে আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। আকস্মিকভাবে সরকারি ওই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় হাসপাতালের পরিচালকসহ কয়েক কর্মকর্তাকে তাদের কক্ষে অবরুদ্ধ করে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার সাংবাদিকদের জানান, নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কোনো কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে পরিচালক হিসেবে আগে আমাকে জানানোর কথা। তবে আমাকে কেউ কিছু জানাননি। ডা. মামুন হাসপাতালের ডরমিটরিতে থাকতেন। তাকে ভোর ৪টায় ধরে নিয়ে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানোর পর তিনি জিডি করার পরামর্শ দেন। এরপর থানায় জিডি করি। পরে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে পুরো বিষয়টা জানতে পারি।
পরিচালক আরও বলেন, ডা. মামুনকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে সবাই ক্ষুব্ধ। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সুরাহায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছি। একই সঙ্গে রোগীদের দুর্ভোগ হয়, এমন কোনো কর্মসূচি না দিতে আন্দোলনকারীদের আহ্বান জানিয়েছি। এর পরই তারা চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেছেন বলে জানান পরিচালক।
এদিকে পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অন্য আসামিদের জবানবন্দিতে ডা. মামুনসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। মোটা কমিশনের লোভে তারা সরকারি চিকিৎসক হয়েও মাইন্ড এইডে রোগী পাঠিয়ে দিতেন। তাকে গ্রেপ্তারে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। বরং মাইন্ড এইডের অনেকের গ্রেপ্তারের পর ডা. মামুনের পালিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মাইন্ড এইডে কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগে আরও দু'জন চিকিৎসকের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তারা হলেন- ডা. মো. রাহেনুল ইসলাম ও ডা. জুবায়ের।
আনিসুল হত্যা মামলায় রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড মানসিক হাসপাতালের আরও চার কর্মচারীকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মারধর করে এএসপি আনিসুলকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাদের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমান কারাগারে পাঠানোর এ আদেশ দেন।
এদিকে চিকিৎসককে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী। এক যুক্ত বিবৃতিতে বিএমএ নেতৃবৃন্দ বলেন, ডা. মামুনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও হয়রানিমূলক। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া একজন সরকারি চিকিৎসক কর্মকর্তাকে এভাবে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডের নেওয়ার ঘটনা চিকিৎসক সমাজকে সংক্ষুব্ধ করেছে। আদালতের নির্দেশনা ছাড়া এভাবে চিকিৎসককে গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলে দেশে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া ডা. মামুনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি। বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আনিসুলকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার পরিবর্তে তার বোন ও ভগ্নিপতি প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করাতে ইচ্ছুক ছিলেন। স্বেচ্ছায় আনিসুলের স্বজনরা মাইন্ড এইডে নিয়ে যান।