নেত্রকোনার বিউটি রানী ভৌমিক বছর খানেক আগে প্রেমের বিয়ের পর স্বামী দোলন চন্দ্রের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে। টানাটানির সংসারে স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখেছিলেন বিয়ের শাড়ি, নূপুর আর গহনা। সোমবার রাতের ভয়াবহ আগুনে ঘর-গৃহস্থালির সঙ্গে পুড়েছে তার স্মৃতিটুকুও। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ভস্মীভূত বস্তির ঘরখানির ছাই ঘেঁটে পুড়ে যাওয়া লাল শাড়ির একটা অংশ পান তিনি। সেটি দেখিয়ে হাহাকার ভরা চোখে বলছিলেন, কিছুই আর রইল না।
সোমবার রাতের ওই আগুনে বিউটি রানী ভৌমিকের মতো শতাধিক পরিবার ঘরহীন হয়েছে। পুড়ে গেছে তাদের ছোট্ট ঘরের আসবাব থেকে শুরু করে গৃহস্থালির সবকিছুই। শিশুদের বই থেকে পোশাক কিছুই রক্ষা পায়নি। সারাদিন খেটে বাসায় নিয়ে যাওয়া কেজি খানেক চাল, তরকারির কিছুই রক্ষা হয়নি আগুনে। বস্তিবাসীর ঘর-সংসারের সঙ্গে আগুনে তাদের স্বপ্নও পুড়েছে।
গত আট বছরে সাততলা বস্তিতে চারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। প্রতিবারই নিম্ন আয়ের বাসিন্দারা সব হারিয়ে নিঃস্ব হন। তাদের কপালে প্রাপ্য সহায়তাও জোটে না। গতকাল বস্তির পুরোনো বাসিন্দারা বলছিলেন, এর আগে ২০১২ সালে, ২০১৫ সালে এবং পরের বছরও আগুনে পুড়েছিল বস্তিটি। বারবারই বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক গোলযোগে আগুন লেগেছে।
সোমবার রাতের আগুনের সূত্রপাতের বিষয়েও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, রাত পৌনে ১২টার দিকে বৈদ্যুতিক গোলযোগে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে এতে ৯৯টি দোকান ও ঘর পুড়েছে। যদিও বস্তির লোকজন বলছেন, অন্তত ২০০ বসতঘর আর ৭০টি দোকান পুড়ে ছাই হয়েছে।
গতকাল সকালে সরেজমিন দেখা যায়, মহাখালীর জাতীয় সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে এই পুরোনো বস্তি। এর মধ্যে দক্ষিণপাড়া এলাকায় আগুনে দোকান ও ঘরগুলো পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। বাঁশ, কাঠ, টিন আর ইটের দুর্বল গাঁথুনিতে প্রায় প্রত্যেকটি ঘরই দোতলা ছিল। লোকজন পুড়ে যাওয়া আসবাব আর ছাই ঘেঁটে শেষ সম্বলটুকু খুঁজছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় পোড়া চাল, ডাল, তরকারিসহ নানা আসবাবের অংশ বিশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।
বস্তির একটি পুড়ে যাওয়া ঘরের সামনে কাঁদছিলেন মফিজ উদ্দিন। আগুনে ঘরসহ তার ব্যাটারিচালিত তিন রিকশাও পুড়ে গেছে। ছোট ছোট প?াঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি ওই বস্তিতে থাকছিলেন। পুড়ে যাওয়া রিকশাগুলোই ছিল তার সংসার চালানোর সম্বল।
পুড়ে যাওয়া বস্তির মাঝামাঝি এলাকায় ছাইয়ের ওপর দেড় বছরের মেয়ে নাতাশাকে নিয়ে হতাশ হয়ে বসেছিলেন রিনা বেগম। পাশে আরও দুই সন্তান ১৪ বছরের সুমাইয়া ও সাত বছরের লিখন। রিনা বলছিলেন, স্বামী বাবর হোসেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিনি বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। আগুন লাগার পর শুধু প্রাণ নিয়েই বের হতে পেরেছিলেন, আর সবকিছুই পুড়ে গেছে।
গতকাল দুপুরের দিকে তার সঙ্গে কথা বলার সময় কোলে থাকা নাতাশা আর লিখনের হাতে দুটি বন রুটি আর একটি কলা ছিল। রিনা বেগম বলছিলেন, রাতের আগুনের পর সকালে সন্তানদের কিছুই খেতে দিতে পারেননি। ছেলেমেয়ের কান্নায় কেউ একজন তাদের কলা আর রুটি কিনে দিয়েছেন।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত জুলেখা বেগমও বাসাবাড়িতে কাজ করেন। স্বামী মানিক মিয়া অন্যত্র বিয়ে করার পর তিনি পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে বস্তির ছোট্ট একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। তিনি বলছিলেন, তার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকল না। কী খাবেন, কী পরবেন তাও বুঝতে পারছেন না। দুপুর পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো তরফেই নূ্যনতম সহায়তাও পাননি।
বসতঘরের সঙ্গে বেশ কয়েকটি দোকানও পুড়েছে ওই আগুনে। বস্তিতে ঢুকতেই আবুল কালামের মুদি দোকানটিও রক্ষা পায়নি। আবুল কালাম বলছিলেন, তার সাত থেকে আট লাখ টাকার মালপত্র সবই পুড়ে গেছে।
ভয়াবহ ওই আগুনের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবুল বাসার সমকালকে বলেন, বস্তিতে অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল। এর সঞ্চালন তারগুলো একেবারেই দুর্বল। একটি দোকানের ফ্রিজে সঞ্চালন লাইনের দুর্বল তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা দ্রুতই পুরো বস্তি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়া হয়েছে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে, যা ভয়াবহ। এজন্য আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। তবে ফায়ার কর্মীদের চেষ্টায় পুরো বস্তিতে আগুন ছড়াতে পারেনি।



বিষয় : সাততলা বস্তিতে আগুন

মন্তব্য করুন