পরপর দুই দিনে রাজধানীর তিনটি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার গভীর রাতে আগুনে পুড়ে গেছে পল্লবীর কালশী এলাকার বাউনিয়া বাঁধের বস্তি। এতে ৪৩টি বসতঘর ও ১২টি দোকান ভস্মীভূত হয়। এসব ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও নিম্নআয়ের মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ঠান্ডার মধ্যে তাদের খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে। এভাবে বস্তিতে একের পর এক আগুনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, এসব কী নিছক দুর্ঘটনা, নাকি কোনো নাশকতা? কেউ কেউ বলছেন, এসবের জন্য বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই দায়ী। কারণ তিন ক্ষেত্রেই বস্তিতে অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া গেছে। অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ বা গ্যাসের চুলা থেকেই বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বস্তির নিয়ন্ত্রণ নিতে ষড়যন্ত্র করে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। কারণ সেখানে অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় হয়। আর সেই টাকা স্থানীয় রাজনৈতিক অসাধু নেতাকর্মীদের পকেটে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, আগুন লাগার পর বস্তির জায়গাটি অন্য নতুন পক্ষ দখলে নিয়েছে। তাই আগুন লাগার ঘটনা অনেক সময় বস্তি উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।
সোমবার মধ্যরাতে আগুনে পুড়ে যায় রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তির কয়েকশ ঘর। এরপর মঙ্গলবার বিকেলে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বিহারিপট্টি ও একই দিন গভীর রাতে কালশীর বস্তিতে আগুন লাগে। তিন ঘটনাতেই ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নেভায়। তবে ততক্ষণে পুড়ে যায় খেটেখাওয়া বহু মানুষের সর্বস্ব। পুড়ে যায় তাদের স্বপ্নও।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দুই দিনে তিন বস্তিতে আগুন নিছক দুর্ঘটনা বলে মনে হয় না। পরিকল্পিতভাবে এগুলো লাগানো হয়েছে কিনা, অনুসন্ধান করতে হবে। আর এসব ঘটনায় বহু নারী-পুরুষ গৃহ ও সম্পদহীন হয়ে
পড়েছে। বস্তিবাসীর ব্যাপারে প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে সিটি করপোরেশনকে। মানবিক কারণে নগরপিতা ও কাউন্সিলরসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মূল দায়িত্ব এই অসহায় মানুষদের সমস্যার সমাধান করা। পরে আসবে স্থানীয় সরকার বা এনজিওর ভূমিকা। আর অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ থেকে দুর্ঘটনা ঘটে থাকলে দায়িত্ব কার? নিশ্চয়ই সরকারি কোনো সংস্থাকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। বস্তি একটা বাস্তবতা। তারাও কিন্তু ঢাকারই মানুষ। গৃহায়ন নীতিমালায় বস্তির ব্যাপারেও বলা আছে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব সমকালকে বলেন, এ মুহূর্তে সেবা সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। বস্তি থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের হঠাতে হবে। বাসিন্দারা যেহেতু গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, নিশ্চয়ই তারা এর জন্য টাকা দিচ্ছেন। সংস্থাগুলো বাসিন্দাদের নিরাপদ সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সুরক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মানসম্পন্ন তার, পাইপ, মিটার, সার্কিট ব্রেকারের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হবে। আর সার্বিক বিষয়ের তদারকি করতে হবে সিটি করপোরেশনকে। সিটি করপোরেশনের তো বস্তি উন্নয়ন কমিটিও রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবুল বাশার সমকালকে জানান, বেশিরভাগ ঘটনাতেই বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত। এর কারণ বস্তিতে খুবই নিম্নমানের তারে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। দুর্বল ওই তারগুলো পর্যাপ্ত তাপ সহ্য করতে পারে না। ফলে বৈদ্যুতিক গোলযোগের মতো ঘটনা ঘটে। আর একবার আগুনের সূত্রপাত হলে সেখানে আগুন ছড়ানোর মতো অনেক উপাদান বিদ্যমান। বস্তির ঘরের উপাদান বাঁশ-কাঠে দ্রুত আগুন ধরে যায়। আর ঘরগুলোয় সাধারণ প্লাস্টিকের পাইপে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। আগুনের তাপে সেই পাইপ গলে গ্যাস বেরিয়ে আসে। এতে ভয়াবহ আকার ধারণ করে আগুন। এখন শুস্ক মৌসুম হওয়ায় আগুনের ঘটনা বেশি ঘটছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কালশীর বস্তিতে আগুন :ফায়ার সার্ভিস জানায়, মঙ্গলবার রাত সোয়া ২টার দিকে কালশী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বাউনিয়া বাঁধ বস্তিতে আগুন লাগে। টিন-কাঠ-বাঁশের তৈরি ঘরগুলোয় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে স্থানীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি শুরু করেন। পরে তাদের কেউ কেউ পানি ঢেলে আগুন নেভানোরও চেষ্টা চালান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট সেখানে যায়। তাদের এক ঘণ্টার চেষ্টায় সোয়া ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে পুরোপুরি নেভাতে আরও সময় লেগে যায়।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বাউনিয়া বাঁধ এলাকার ওই বস্তির বাসিন্দাদের বেশিরভাগই দিনমজুর, কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক ও গৃহকর্মী। নিম্ন আয়ের এই মানুষেরা কম ভাড়ার কারণে বস্তির ঘিঞ্জি ঘরগুলোয় থাকতে বাধ্য হন। কাঁচা বা আধাপাকা এই ঘরগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি লাগানো। ফলে কোনো একটিতে আগুন লাগলে তা ছড়াতে সময় নেয় না।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরের টিন সরিয়ে অক্ষত বা আধাআধি পুড়ে যাওয়া ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে। কেউ আবার টিনগুলো নিয়ে এক স্থানে জড়ো করছেন পরে ব্যবহারের আশায়। এক শিশুকে দেখা গেল স্বজনের পাশে পোড়া কাঠ সরিয়ে নিজের খেলনা খুঁজতে।
বস্তির বাসিন্দা জুলহাস মিয়া জানান, তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। সাত বছর ধরে আছেন ওই বস্তিতে। দুই বা এক বছর পরপরই সেখানে আগুন লাগে। তাদের ধারণা, এগুলো বস্তি উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র। কারণ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি পক্ষ এখন বস্তি নিয়ন্ত্রণ করে। আবার তাদের প্রতিপক্ষ বস্তির দখল পেতে চায়। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও দেখা দেয়, ঘটে সংঘর্ষ।
বস্তির বাসিন্দারা জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য মাসে ৩০০ বা ৩৫০ টাকা দিতে হয়। একইভাবে গ্যাসের জন্যও টাকা দিতে হয়। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে এসব টাকা তোলা হয়। এই টাকার ভাগ পেতে দুই পক্ষ মুখোমুখি। মো. রাকিব নামে এক বাসিন্দা সরাসরিই বললেন এ কথা। তিনি বলেন, বস্তির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার জন্য একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
তবে অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কয়েকটি গ্যারেজ ছিল বস্তিতে। গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ ছিল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত।
এর আগে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে বাউনিয়া বাঁধ বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই আগুনে পুড়ে যায় বস্তির শতাধিক ঘর। সেবার বস্তির একটি ভাঙাড়ির দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই ঘটনার ১১ মাসের মাথায় আবারও বস্তিটিতে আগুন লাগল।
এদিকে তিন বস্তির আগুনের ক্ষেত্রেই সরু রাস্তার কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে বেগ পেতে হয় ফায়ার কর্মীদের। সেই সঙ্গে যোগ হয় পানির উৎসের অভাব। এসব কারণে আগুন নেভানোর প্রক্রিয়া শুরু করতেই বেগ পেতে হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, দেশে গত বছর অন্তত ১৪৪টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই ২৫টি বস্তিতে আগুন লেগেছে। এসব আগুনে ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি। এ বছরের পরিসংখ্যান এখনও প্রস্তুত হয়নি।
অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ :প্রতিবার অগ্নিকাণ্ডের পর অবৈধ বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগের বিষয়টি উঠে আসে। এসব ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী কিছু লোকের নামও সামনে চলে আসে। তবে দেখা যায়, সাধারণত কোনো পক্ষই তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অনেক সময় সুবিধাভোগীদের তালিকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও থানা পুলিশের কোনো সদস্যেরও নাম থাকে। ফলে প্রতি বছর একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন সমকালকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। তাছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিষয়টি দেখার জন্য আলাদা সংস্থা রয়েছে। তারা এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিলে পুলিশ তাদের সহায়তা করবে।


বিষয় : আগুনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ

মন্তব্য করুন