নির্বাচনী বক্তব্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ওয়ার্ডে মাদকের কোনো চিহ্ন থাকবে না। অথচ তিনি নিজেই প্রতিদিন মদ্যপান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় লোকজনকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অডিও রেকর্ডও রয়েছে একাধিক। 'গুণধর' এই ব্যক্তিটি হলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মান্নান। তার ছেলে নাজমুস সাকিবের মাদক সেবনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এলাকাবাসীর দাবি, যে কোনো ব্যবসা পরিচালনা, সড়কে যানবাহন পার্কিং, মালপত্র লোড-আনলোড, এমনকি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান করতে গেলেও চাঁদা দিতে হয় তার লোকজনকে। ঢাকা-৭ আসনের আলোচিত সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ঘনিষ্ঠজন হওয়াই তার দাপটের মূল উৎস বলে মনে করেন এলাকার মানুষ।
বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মাদকসেবীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিছু লোক আমার নামে অযথা দুর্নাম ছড়ায়। ডোপ টেস্ট করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। আর ছেলের যে ভিডিও সেটিও ভুয়া। আমার ছেলের মতো দেখতে আরেকজনের ভিডিও।\হচাঁদাবাজির অভিযোগও ঠিক না।\হপুরান ঢাকার বংশাল রোড, কে পি ঘোষ স্ট্রিট, কসাইটুলি, গোবিন্দ দাস লেন, সৈয়দ হাসান আলী লেন, পি কে রায় লেন, হাজী আবদুর রশিদ লেন, রায় বাহাদুর ঈশ্বর চন্দ্র ঘোষ স্ট্রিট, কাজী জিয়াউদ্দিন রোড, সামসাবাদ লেন, শাহজাদা মিয়া লেন, গোপীনাথ দত্ত কবিরাজ স্ট্রিট, হরনী স্ট্রিট, বাগডাসা লেন, হায়বাৎ নগর লেন, শরৎ চক্রবর্তী রোড, কাজীমুদ্দিন সিদ্দিকী লেন, আকমল খান রোড, জিন্দাবাহার লেন ও জুমবালী লেন এলাকা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ড। সরেজমিন এসব এলাকা ঘুরে মানুষের নানা অভিযোগের কথা জানা যায়।
আরমানীটোলা মাঠ, শরৎ চক্রবর্তী রোড, আনন্দময়ী স্কুল, আহমেদ বাওয়ানী স্কুল ও বটতলা এলাকায় দিনের বেলাতেই দেখা যায় ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের সারি। রাস্তার পাশে পার্ক করে মালপত্র ওঠানো-নামানোর কাজ চলছে। ফলে সারাদিনই সড়কে যানজট লেগে থাকে। পাশেই সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল। সেখানে রোগী ও চিকিৎসক-নার্সদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে বড় বাধা এই যানজট। ভুক্তভোগীদের দাবি, দিনের বেলা পণ্যবাহী যান ঢোকানোর নিয়ম না থাকলেও কাউন্সিলরের লোকজন টাকার বিনিময়ে এগুলো ঢুকতে দেয়। সড়কে ঢোকার জন্য গাড়িপ্রতি দিনে দেড় হাজার টাকা, তার সঙ্গে পার্কিং বাবদ আরও ৪০০ টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে একজন ব্যবসায়ী প্রতিদিন এক হাজার ৯০০ টাকা চাঁদা দেন। ওই এলাকায় এ রকম ব্যবসায়ীর সংখ্যা শতাধিক। সংশ্নিষ্টরা জানান, কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠজন কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর শিকদার এসব টাকা তোলেন।\হএদিকে বাবুবাজারে বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে গাড়ি পার্কিংয়ের ইজারাও নিয়েছেন কাউন্সিলরের লোকজন। কাগজপত্রে একজনের নাম থাকলেও মূলত কাউন্সিলরের সহযোগীরাই পার্কিং পরিচালনা ও অর্থ আদায় করেন। এখানেও রয়েছে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ। ইজারার শর্ত বেশিরভাগই মানা হচ্ছে না। সম্প্রতি হাবীবুর রহমান হবি নামে একজন এসব বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণের মেয়রসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।\হঅভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছে ১৬টি পরিবহন প্রতিষ্ঠান। এগুলোর প্রতিটি থেকে অফেরতযোগ্য দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিন ভাড়া হিসেবে দুই হাজার টাকা নিচ্ছে ইজারাদারের লোকজন। পাশাপাশি ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান, মাস্ক-হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও কাপড়ের দোকান বসিয়ে অবৈধভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব দোকানের জন্য বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিয়েও টাকা আদায় করা হচ্ছে। আবার গাড়ির পার্কিং ফি ১০ ও ২০ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। রাত ৮টার মধ্যে পার্কিং কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা গভীর রাত পর্যন্ত চলে। ব্রিজের নিচের অবৈধ চায়ের দোকানগুলোয় ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সেতুরও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পার্কিংয়ের জন্য ২৮ হাজার ৫১ বর্গফুট জায়গা ইজারা দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত জায়গা থেকে ৩০০ গজ দূরে বাদামতলীতে সিটি করপোরেশনের স্লিপ ব্যবহার করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া ট্রাক, লরি বা কাভার্ডভ্যানের মতো ভারী যানবাহন পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেতুর নিচে মালপত্র আনলোড করছে এসব যানবাহন।\হআবদুল মান্নান ঢাকা মহানগর পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতিরও নেতা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার সহযোগীরা পণ্যবাহী ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানে যশোর থেকে ফেনসিডিলের চালান ঢাকায় আনে বলে অভিযোগ রয়েছে।\হমাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল :কাউন্সিলর বাবা মাদকমুক্ত ওয়ার্ড গড়ার ঘোষণা দিলেও ছেলে নাজমুস সাকিবের মাদক সেবনের কথা এলাকার লোকজনের মুখে-মুখে। তার নেশাদ্রব্য সেবনের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।\হ২০১৮-১৯ সালে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাকিব। বংশাল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইমরান হোসেন জন সমকালকে বলেন, ভিডিওতে যে ছেলেটিকে দেখা যায়, তিনি সাকিব। মাদকাসক্তির অভিযোগ ওঠায় ছাত্রলীগের ওই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।\হএদিকে কাউন্সিলর আবদুল মান্নান নিজেও প্রায় প্রতিদিন মদ্যপ অবস্থায় লোকজনকে ফোন দিয়ে গালাগাল করেন, হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেসব কথোপকথনের কয়েকটি অডিও রেকর্ড থেকে শোনা যায় এক জায়গায় তিনি বলেছেন, তার সঙ্গে দেখা না করলে সেই ব্যক্তি এলাকায় থাকতে পারবেন না। আরেক জায়গায় হুমকি দিয়ে বলছেন- তুই কিন্তু সাইজ হইয়া যাইবি।
সম্প্রতি যুবলীগের স্থানীয় কার্যালয়ে পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় কাউন্সিলরসহ কয়েকজন সেখানে মদ্যপান করছিলেন। প্রথমে আটক করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছে পুলিশ। মহানগর পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার ইলিয়াছ হোসেন সমকালকে বলেন, অন্য একটি মামলার আসামিদের সন্ধানে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছিল। কাউন্সিলর সম্পর্কিত তথ্য সঠিক নয়।
আগে চাঁদা, পরে কাজ :৩২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে কাউন্সিলরের লোকজন। সব ক্ষেত্রেই দিতে হয় চাঁদা। এমনকি গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহের কাজ দেওয়ার কথা বলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়েছে। জয়নাল হাজারী নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে করোনার শুরুর দিকে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন কাউন্সিলর মান্নান। তবে সে কাজ তাকে দেওয়া হয়নি। অনেক ঘোরাঘুরির পর শেষ পর্যন্ত ৩৫ হাজার টাকা ফেরত পেয়েছেন।
হাজী জুম্মন কমিউনিটি সেন্টারে কোনো অনুষ্ঠান করতে গেলেও দিতে হয় চাঁদা। সেখানে যে বাবুর্চি রান্না করবেন তাকে প্রত্যেক হাঁড়ি খাবারের জন্য ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। একইভাবে যে অনুষ্ঠানের স্টেজ সাজানো ও ফুল সরবরাহের কাজ করেন তার কাছ থেকে এককালীন তিন লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। চারটি ডেকোরেটর কমিউনিটি সেন্টারে জিনিসপত্র সরবরাহের অনুমোদন পেয়েছে। এজন্য তাদের দিতে হয়েছে মোট ১৬ লাখ টাকা। আলোকসজ্জার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে দিতে হয় প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা। রাত ১২টার পর অনুষ্ঠান চললে দিতে হয় অতিরিক্ত চার হাজার টাকা। বুলবুল নামে মান্নানের এক সহযোগী এসব টাকা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া বাদামতলীর ফল মার্কেট এলাকায় বেড়িবাঁধের মূল সড়কে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে ফলের গাড়ি রেখে আনলোড করা হয়। এজন্য পিঞ্চু হাজী নামে একজনকে গাড়িপ্রতি এক হাজার টাকা দিতে হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ গাড়ি আসে। সেখান থেকে একটি অংশ চলে যায় কাউন্সিলরের কাছে। আবার ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা কাগজ পরিবহনকারী গাড়িপ্রতি নেওয়া হয় ৭৫০ টাকা। সেখানে টাকা তোলেন জাহাঙ্গীর।\হএদিকে অবৈধভাবে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে দুটি, বাদামতলীতে একটি ও আরমানীটোলা মাঠের কোনায় একটি টয়লেট পরিচালনা করেও টাকা আদায় করা হচ্ছে। টয়লেটসংলগ্ন খালি জায়গায় প্রতিদিন তিনটি ফলের কনটেইনার রাখা হয়। সেখান থেকে ফল বিক্রেতারা ফল নিয়ে যান। প্রতি কনটেইনারের জন্য সানি নামে একজন প্রতিদিন তিন হাজার টাকা আদায় করেন।\হএলাকাবাসী যা বলেন :কাউন্সিলর আবদুল মান্নান সম্পর্কে প্রকাশ্যে কেউই মন্তব্য করতে চান না। যারা বলেছেন, তারা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। কোতোয়ালি থানা বিএনপির এক নেতা বলেন, বেড়ায় যদি ক্ষেত খায়, তাহলে আর কীভাবে অবস্থার পরিবর্তন হবে? কাউন্সিলর নিজে প্রতিদিন মদ্যপান করেন। তার ছেলেও মাদকাসক্ত। তার একটি ভিডিও তো লোকজনের হাতে হাতে। অবস্থা এমন যে, কমিউনিটি সেন্টারে যে বাবুর্চি রান্না করেন, তার কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়। তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে কী অবস্থা বুঝতেই পারেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বাবর মুন্সী বলেন, কাউন্সিলরের ছেলে যে মাদকাসক্ত এ কথা সত্যি। শুনেছি কাউন্সিলরও নিয়মিত মদ খান। আহমেদ বাওয়ানী একাডেমির অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন মুকুল বলেন, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মন্তব্য করব না। কসাইটুলী সমাজকল্যাণ পরিষদের সহসভাপতি ও ক্রীড়া সংগঠক তাজউদ্দিন পাপ্পুর কাছে কাউন্সিলরের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই অবস্থা আরও কয়েকজনের ক্ষেত্রে।\হহাজী জুম্মনের সহযোগী থেকে নিজেই কাউন্সিলর :নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন ৬৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার হাজী জুম্মনের সহযোগী ছিলেন আবদুল মান্নান। গত নির্বাচনে জিতে নিজেই হয়েছেন কাউন্সিলর। এর পর থেকে এলাকায় তার দাপট বহুগুণে বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, আবদুল মান্নান পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। পরে তিনি আল-আরফ ট্রান্সপোর্টে চাকরি করেন। ধীরে ধীরে তিনি কৌশলে ওই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেন। এক পর্যায়ে তিনি ঢাকা মহানগর পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতির নেতৃত্বে চলে আসেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও একসময় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও যথেষ্ট সখ্য ছিল, এখনও আছে। কেউ কেউ দাবি করেন, মান্নান একসময় বিএনপির রাজনীতিই করতেন। তবে নিরপেক্ষ সূত্র থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আগের কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক পদে ছিলেন আবদুল মান্নান।

বিষয় : মাদক থেকে চাঁদাবাজি সবখানেই মান্নান

মন্তব্য করুন