'পুরা ট্যাকা দে। এক ট্যাকাও কম নিমু না, আট আনাও কম নিমু না। ফাজলামি সবসময় ভাল্লাগে না। কালকেও দিছে কম, ডেইলি কস কম। মাঝখানে একটি দোকান দিয়া দিছে, তাও ঠিকমতো টাকা দেবে না।'
চাঁদার টাকা কম দেওয়ায় এক মাংস ব্যবসায়ীকে এভাবেই হুমকি দেন চাঁদাবাজ হিসেবে অভিযুক্ত বাবুল ঢালী। প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে রাজধানীর শনির আখড়ায় সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে বাজার বসিয়ে হুমকি দিয়ে চাঁদা তোলেন 'ফিটফাট' বাবুল ঢালী। পণ্য বিক্রি কম হওয়ায় কোনো ব্যবসায়ী চাঁদার টাকা কম দিতে চাইলেই তিনি হুমকি দেন, দোকান তুলে দেওয়া হবে।
প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সোয়া ৮টার মধ্যে সহযোগী মো. সোহাগকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে প্রকাশ্যে চাঁদা তোলেন বাবুল ঢালী। সোমবার সরেজমিন ঘুরে চাঁদা তোলার দৃশ্য দেখা যায়। বাবুল ঢালী চাঁদা তুলছেন- এমন ভিডিও এবং স্থিরচিত্রও রয়েছে সমকালের কাছে।
চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে বাবুল ঢালী চাঁদা তোলার কথা অস্বীকার করেন। সোমবার সরেজমিন চাঁদা তুলতে দেখা গেছে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করা হয়েছে জানালে তিনি টাকা তোলার কথা স্বীকার করে বলেন, 'আপনি কোথায় আছেন। আসেন সামনাসামনি বসে কথা বলি।' চাঁদার টাকার ভাগ কে কে পায় জানতে চাইলে ফোনে বলেন, 'এই টাকা অনেকের কাছেই যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ ব্যাপারে সবই জানেন।'
দনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক বাকের বলেন, ওই টাকা তিনি ছুঁয়েও দেখেন না। বাবুল ঢালী টাকা তুলে এক হাজার টাকা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিস খরচ বাবদ অফিসের পিয়ন ইদ্রিসকে দেয়। এক হাজার টাকার মধ্যে তিনশ টাকা ইদ্রিসের হাজিরা বাবদ এবং সাতশ টাকা চা-পানি বাবদ খরচ করা হয়।
বাবুল ঢালীর বাসা দক্ষিণ শেখদীর এক নম্বর গলিতে। আনুমানিক ৫৫ বছর বয়সী বাবুল ঢালীর কোনো পেশা নেই। চাঁদার টাকায় চলেন তিনি। সাবেক দনিয়া ইউপি সদস্য কাজী বদরুল হুদা বিপুর ঘনিষ্ঠ বাবুল। নিজেকে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচয়ও দিয়ে থাকেন। তার সহযোগী সোহাগের বাসাও একই এলাকায়। বাবুল ঢালী যখন চাঁদা তোলেন, তখন তার পোশাকে থাকে আভিজাত্য। এ কারণেই দোকানিদের ভাষ্য- ফিটফাট হয়ে বাবুল ঢালী চাঁদা তোলেন।
যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনির আখড়া দক্ষিণ শেখদীর মাসজিদুল মাদিনা মসজিদের পূর্ব পাশে সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে বসা বাজারটি প্রায় দেড় বছর আগে উচ্ছেদ করে দেয় সংশ্নিষ্ট দপ্তর। কিন্তু সেটি একেবারে উচ্ছেদ করা যায়নি। বিকেল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অবৈধভাবেই সেখানে কাঁচাবাজার বসানো হচ্ছে প্রতিদিন। সোমবার সন্ধ্যার পর সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বাজারে দেড়শতাধিক বিভিন্ন পণ্যের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে সবজির দোকান ৬০টি, মাছের দোকান ৩৬টি, মুরগির দোকান ১৫টি, ডিমের দোকান চারটি, ফলের দোকান ১০টি। এ ছাড়া চটপটি, ফুসকা ও চায়ের দোকান রয়েছে। দোকানভেদে একশ টাকা থেকে দুইশ টাকা চাঁদা তোলা হয়।
গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় সরেজমিন দেখা হয় শনির আখড়ার অস্থায়ী ও অবৈধ এ বাজারটিতে চাঁদাবাজির চালচিত্র। দেখা যায়, বাবুল ঢালী প্রতিটি দোকানে গিয়ে নিজের হাতেই চাঁদার টাকা তুলছেন। সোহাগ বডিগার্ডের মতো তার পাশাপাশি হাঁটছেন। সোয়া ৭টায় দেখা যায় এক শিম বিক্রেতার কাছে হাজির হন বাবুল ঢালী ও সোহাগ। বিক্রেতা ৫০ টাকা দিতে গেলে নেবেন না বলে জানিয়ে দেন বাবুল। দোকানি তাকে অনুরোধ করেন, মাল কম তুলেছেন দোকানে। ক্রেতাও কম। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাবুল ঢালী হুমকি দেন, 'ফাও আলাপ ছাড়ো। সোজা হইয়া ট্যাকা দাও।' বাধ্য হয়ে একশ টাকার একটি নোট দেন তিনি। বাবুল অন্য দোকানে যাওয়ার পর শিম বিক্রেতা জানান, প্রতিদিন তো বেচাকেনা সমান হয় না। মালও প্রতিদিন উঠানো হয় না দোকানে। দু-একদিন টাকা কম দিলেই দোকান তুলে দেওয়ার হুমকি দেন বাবুল। সরেজমিন এরকম বেশ কয়েকজন দোকানিকে হুমকি দিতে দেখা গেছে তাকে।
চাঁদা তোলার পর রাত সোয়া ৮টায় বাবুল ঢালী ও সোহাগ হাঁটতে হাঁটতে বাজারের পূর্ব পাশ থেকে আনুমানিক দেড়শ গজ দূরের একটি টিনশেড বাসায় ঢোকেন। পরে জানা যায়, বাসাটি পাপ্পু নামে এক ব্যক্তির। সেখানে প্রতি রাতে চাঁদার টাকা গোছগাছ করেন তারা। ১৫ মিনিট পর ওই বাসা থেকে বেরিয়ে তারা আসেন বাজার সংলগ্ন দনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিসে। সেখানে সাবেক মেম্বার বদরুল হুদা বিপুসহ ১৫-২০ জন নেতাকর্মী ছিলেন।
তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, বাবুল চাঁদার টাকা বদরুল হুদা বিপুর হাতে দেন। এরপর ভাগবাটোয়ারা হয়। এ ব্যাপারে বদরুল হুদা বিপুর মন্তব্য নিতে একাধিকবার তাকে ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ সমকালকে বলেন, চাঁদা তোলার বিষয়টি তাদের জানা নেই। যদি কেউ সরকারি জায়গায় বাজার বসিয়ে চাঁদা তুলে থাকে, সেটা অনৈতিক কাজ। বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

বিষয় : শনির আখড়ায় ফিল্মি স্টাইলে চাঁদাবাজি

মন্তব্য করুন