টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে চুরির অভিযোগে আদিবাসী নারীর ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়, তাতে আমরা স্তম্ভিত। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, 'ছয় মাসের বাচ্চাকেও তারা দুধ খেতে দেয়নি'। কতটা নির্দয় হলে নিষ্পাপ শিশুর ওপরও এমন প্রতিশোধ নেওয়া সম্ভব! এমন অভিযোগে তাকে নিপীড়ন করা হয়, যার কোনো ভিত্তিই নেই। এ ঘটনার মামলার বিবরণে আমরা যা জেনেছি, তাতে ওই নারী কোনোভাবেই অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। বস্তুত ওই নারীর এক সন্তান নির্যাতনকারীদের সন্তানদের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসেবে খেলাধুলা করত। ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে নির্যাতনকারীদের বাড়ি থেকে ওই নারীর সন্তান ঘুড়ি বানানোর জন্য পত্রিকা আনে। এর মাঝে হঠাৎ তাদের বাড়ি থেকে স্বর্ণ ও টাকাসহ মূল্যবান কাগজপত্র চুরি হয়ে গেলে তারা ওই সন্তানকে ধরে নিয়ে মারধর করে এবং হুমকি দিলে ভয়ে বাচ্চাটি চুরির স্বীকারোক্তি দেয়। তারা জোর করে বাচ্চার স্বীকারোক্তিই নেয়নি, একইসঙ্গে বাড়িতে গিয়ে ওউ নারীকে গালাগাল করে। এরপর তাকে বাড়ি থেকে ধরে এনে বাগানে গাছে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটায়। প্রায় চার ঘণ্টা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার সময় ওই নারীর ছয় মাসের সন্তান মায়ের দুধের জন্য কান্নাকাটি করলেও এতটুকু মায়া জন্মেনি। এখানে তারা একইসঙ্গে একাধিক গুরুতর অপরাধ করেছে। প্রথমত, তারা বাচ্চাটির স্বীকারোক্তির জন্য জোর করেছে। এরপর বাচ্চাটিকে অভিযুক্ত করে পরিবারের লোকজনকে গালিগালাজ করেছে। একইসঙ্গে বাচ্চার 'অপরাধের' কারণে আইন নিজ হাতে নিয়ে মায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। আর ছয় মাসের সন্তানকে দুধ খাওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয়টি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আরও গুরুতর অপরাধ হলো, মামলা করার পর ওই নারী ও তার পরিবারকে আসামিরা হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা চাই, এসব গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। একইসঙ্গে ওই নারী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত করা হোক। আমরা দেখেছি, নির্যাতনের স্বীকার নারী একজন আদিবাসী। আসামিরা হয়তো ভেবেছে, আদিবাসী নারী বলে নির্যাতন করেও তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু আমরা দেখতে চাই, আইনের হাত আসামিদের চেয়েও শক্তিশালী। ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে আইনের স্বার্থেই অপরাধীদের শাস্তি হওয়া জরুরি। না হলে এসব অপরাধ ঘটতেই থাকবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা সময়ে এ ধরনের অপরাধ আমরা সংঘটিত হতে দেখি। বস্তুত সমাজের দুর্বল শ্রেণির ওপর প্রভাব খাটানোর যে মানসিকতা রয়েছে, তার কারণেই এসব ঘটছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে ঘটা গুরুতর শিশু নির্যাতনও তার বাইরে নয়। সমাজে কোনো অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটলে তার বিচারের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দায়ের করা। না হলে অন্তত স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ সমাজের গণমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তার সালিশ বসানো যেতে পারে। তা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বলা চলে, এটি তখনই ঘটছে, যখন কথিত অপরাধী দুর্বল শ্রেণির নয়। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের আলোচ্য ঘটনাটিও তার বাইরে নয়। এখানে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিচার করতেই হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি বলেই আমরা জেনেছি। যে কোনো প্রকারেই হোক আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। সামাজিক এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিচারের বিকল্প নেই। আমরা চাই, প্রশাসন সব অপরাধের ব্যাপারে তৎপর হোক। অপরাধ করে পার পাওয়া যায়- এমন ধারণা যেন সমাজে না জন্মে। সাংবিধানিভাবে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। প্রশাসনের ভূমিকার পাশাপাশি সমাজে কোনো অপরাধ হতে দেখলে তা বন্ধে সবার এগিয়ে আসার বোধও জাগ্রত হওয়া জরুরি। সবাই সচেতন হলে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে এমন নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

বিষয় : আদিবাসী নারী নির্যাতন

মন্তব্য করুন