ঢাকার মোহাম্মদপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুটি উদ্বোধনের ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে। 'বছিলা ব্রিজ' নামে অধিক পরিচিত সেতুটি দেখলে মনে হবে বহু দিনের পুরোনো। অযত্ন আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নির্মাণের মাত্র কয়েক বছরেই জৌলুস হারিয়েছে সেতুটি।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ব্যবহার করা সেতুতে রাত নামলেই দেখা দেয় আতঙ্ক। সেতুর ওপর স্থাপন করা ২৯টি সড়কবাতির সবগুলোই নষ্ট। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘুটঘটে অন্ধকারে ছেয়ে যায় চারপাশ। এ কারণে প্রায় প্রতি রাতেই সেতুর ওপর দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন যানবাহন। পথচারীদের হাঁটার জন্য নির্মিত সেতুর পাশের ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে স্লাব উঠে গেছে। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে চলাচল করতে গিয়ে সেসব গর্তে পা পড়ে আহত হচ্ছেন পথচারীরা। এ ছাড়াও অন্ধকার সেতুতে প্রায়ই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ইদানীং রাতের বেলায় সেতু ও এর আশপাশের এলাকায় ভিড় জমছে মাদক ব্যবসায়ীসহ যৌনকর্মীদের।

সেতু দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী ওয়াশপুরের টোটালিয়া পাড়া মসজিদের ইমাম মো. হাসান জানান, কয়েকজনকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে এশার নামাজের পর প্রতিদিনই তাকে বাইসাইকেল নিয়ে মোহাম্মদপুর আসতে হয়। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারের কারণে বাইসাইকেল চালিয়ে সেতু পার হওয়া খুবই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকদিন আগে ছোট একটি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর তিনি সাইকেল নিয়ে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে সেতু পার হন। স্লাব ভাঙা থাকায় সেখানেও খুব সতর্ক থাকতে হয়।

আরশিনগর এলাকার বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মামুন জানান, মাসখানেক আগে ব্রিজের ওপর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিলেন দুই তরুণ-তরুণী। রাত ৯টার দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় অন্ধকার সেতুর ওপর ছিনতাইয়ের শিকার হন তারা। দুটি মোটরসাইকেলে করে ৪-৫ জন ছিনতাইকারী এসে অস্ত্রের মুখে তাদের মোবাইল-মানিব্যাগ সব ছিনিয়ে নেয়। তিনি বলেন, ব্রিজের বছিলা প্রান্তে চেকপোস্ট থাকলেও প্রায়ই সেখানে পুলিশ থাকে না। সেসঙ্গে পুরো ব্রিজ অন্ধকার থাকায় এমন ঘটনা ঘটছে প্রায় দিনই।

সরেজমিন দেখা গেছে, সেতুর দুই পাশে বালু জমে যানবাহন চলাচলের পথ অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া সেতুর কেরানীগঞ্জ প্রান্তে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক তোরণ। এ কারণেও চলার পথ কমেছে অনেকটা। সেতুর দুই পাশের রেলিং ছেয়ে গেছে ব্যানার আর পোস্টারে। সেতুর ওপর নানা স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ইটসহ পাথরের টুকরা। বছিলা প্রান্তের শুরুতেই খোলা স্থানে ময়লা ফেলছে সবাই। সেসব ময়লা এসে জমা হচ্ছে রাস্তায়। দুই প্রান্তে বাস কাউন্টার বসানোয় সেতুতে উঠতে ও নামতে যানজটের কবলে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।

এসব বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা জোন) সবুজ উদ্দিন খান বলেন, বছিলা ব্রিজ এলাকায় চোর-ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য খুব বেশি। সেতুতে লাইট লাগানোর কয়েকদিন না যেতেই তারসহ চুরি হয়ে যায়। এ ছাড়া বছিলা ও কেরানীগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চলছে। এ জন্য প্রচুর মাটি-বালু-ইট-পাথরবাহী ট্রাক চলাচল করে। এতে সেতুটি পরিচ্ছন্ন রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

গত এক বছরে অন্তত ১০ বার সেতুতে লাইট লাগানো হয়েছে জানিয়ে সবুজ উদ্দিন বলেন, লাগানোর কয়েকদিন পরই সেগুলো চুরি হয়ে যায় কিংবা ভেঙে ফেলা হয়। এসব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নয়, পুলিশের। তবে সেতুর ফুটপাতের স্লাব ভাঙা থাকলে দ্রুতই সেগুলো মেরামত করা হবে।

হাজারীবাগ থানার ওসি (তদন্ত) মাসুদুর রহমান বলেন, আগে বছিলা ব্রিজের মুখে হাজারীবাগ থানার চেকপোস্ট ছিল, এখন নেই। আর সেতুর লাইট-তার সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়াও পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ছিনতাইকারী-মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে সেতু এলাকায় প্রায়ই টহল দেওয়া হয়।

স্থানীয় ৩৩ ন?ম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ বলেন, বছিলা ব্রিজ ও এর আশপাশের এলাকায় অনেক সমস্যা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। সেতুর মুখে বাস কাউন্টার বসাতে বারবার নিষেধ করলেও মালিকরা শোনেন না। আশা করছি আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে সেতুর সব সমস্যার সমাধান হবে।