দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর কলাবাগানের নর্থ সার্কুলার রোডের বাসা থেকে মোছা. জান্নাত নামের এক কিশোরী গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বজনরা হত্যার অভিযোগ করলেও তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছিলেন, ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মেয়েটি।

এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়। ধর্ষণে অভিযুক্ত মো. জুনায়েদকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে এখন সেই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ 'পরিস্থিতির শিকার' ভুক্তভোগী পরিবারটি মামলার পথ থেকে সরে এসেছে। বিনিময়ে তারা পেয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা।

মৃত কিশোরীর বাবা আবুল কাশেম সমকালকে বলেন, আমার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। ধর্ষণের পর ঘটনা চাপা দিতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। গৃহকর্তা নিজেই এর সঙ্গে জড়িত হলেও পরে নিরাপত্তাকর্মীর ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা গরিব-অসহায় মানুষ। মামলা চালানোর সামর্থ্য নেই। তাই টাকা নিয়ে চুপ থাকা ছাড়া আর উপায় কী?

গৃহকর্তা মহিউদ্দিন চৌধুরী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং টাকা দেওয়ার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, আমার বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী জুনায়েদ ওই ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। এই দৃশ্য দেখে ফেলে আরেক নিরাপত্তাকর্মী। এরপর লজ্জায় মেয়েটি আত্মহত্যা করে। সেই মামলা চলমান আছে। আমি কাউকে কোনো টাকা দিইনি।

নর্থ সার্কুলার রোডের ৫৮ নম্বর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে আসছিল জান্নাত। ১৩ জানুয়ারি দুপুরে সে ভেজা কাপড় শুকানোর জন্য ৯ তলা ভবনটির ছাদে যায়। সেখানে নিরাপত্তাকর্মী জুনায়েদ মুখ চেপে ধরে তাকে ধর্ষণ করে। পরে বাসার বাথরুম থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে ধর্ষণ ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা করেন।

সংশ্নিষ্টরা জানান, জান্নাতের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ভূঁইয়ারহাট এলাকায়। তার বাবা আবুল কাশেম একজন কৃষক। তার ছয় মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে জান্নাত তৃতীয়। চার বছর আগে সে কলাবাগানের মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে। স্বজনের ভাষ্য, শুরু থেকেই তার ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন গৃহকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যরা। তবু অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে সে কাজ করে যাচ্ছিল। ঘটনার দিন হঠাৎ তার স্বজনদের ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। এখানে এলে তাদের বলা হয়, জান্নাত আত্মহত্যা করেছে।

ঘটনার পর স্বজনরা জান্নাতকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ তুলে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। তবে জানুয়ারির শেষ ভাগে এসে আবুল কাশেম সমকালকে জানান, পরিচিতজনরা তাকে বুঝিয়েছেন যে মেয়েকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না; আবার অনেক টাকা খরচ করে মামলা চালিয়ে যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে তারা গৃহকর্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত দেন। তার এক প্রতিবেশী সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি ১০ লাখ টাকা 'ক্ষতিপূরণ' আদায় করে দেওয়ার কথা বলেন। তবে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকা পাওয়া  গেছে। তার ভাই মো. আলতাফের কাছে ওই টাকা দেওয়া হয়। এরই মধ্যে সেই টাকার বেশ কিছু খরচও করে ফেলেছেন।

মৃতের বড় বোন পারভীন আক্তার সমকালকে বলেন, কী ঘটেছে, তা কেউ দেখিনি। তবে গৃহকর্তা বলেছেন, নিরাপত্তাকর্মী জুনায়েদের সঙ্গে জান্নাতের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সে আত্মহত্যা করে। এটা আমাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তা ছাড়া ওই বাসার বাথরুমের মেঝেতে জান্নাতের পা লেগে ছিল। তাহলে সে কীভাবে গলায় ফাঁস দিল?

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার এসআই বিপ্লব হোসেন সমকালকে বলেন, জান্নাতের মৃত্যুর কারণ ও ধর্ষণের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ। তবে টাকা লেনদেন বা মামলা আপস-রফার ব্যাপারে পুলিশের কিছু জানা নেই। পুলিশের পক্ষ থেকে সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে। বাকি সিদ্ধান্ত আদালতের।