সিসিটিভি ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে, শনিবার রাত তখন তিনটার কিছু সময় বাকি। পর পর তিনজন ঢুকছে রাজধানীর ধানমন্ডির রাপা প্লাজার দোতলায় রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সে। তাদের দুইজনের মুখমন্ডল মুখোশে ঢাকা, একজনের চেহেরা দেখা যাচ্ছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক ওই তিনজনকে দোকানটির ভেতর সক্রিয় দেখা যায়। প্রতিদিনের মতো রোববার সকালে জুয়েলার্সের কর্মচারীরা দোকান খুলতে গিয়ে দেখেন, তালা ভাঙা সার্টার কিছুটা উঠে আছে। কোনো কোনো তালা খোলা অবস্থায় দোকানের সামনের মেঝেতে পড়ে আছে। স্বর্ণালঙ্কারে ভরপুর শোকেসগুলোর ফাঁকা, পুরো দোকানটিই তছনছ করা।

যাচাই-বাচাই করে রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের কর্মীরা জানালেন, তাদের দোকান থেকে অন্তত ৫০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ দুই লাখ লুটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ততক্ষণে লোকজন জড়ো হতেই জানা গেল, একই রাতে পাশের তিনটি পোশাকের দোকানেও হানা দিয়েছে। জেন্টল পার্ক, মুনসুন রেইন ও ভোগ সুলতানা নামের ওই তিন দোকানের ক্যাশ বাক্স ভেঙে নগদ টাকা লুটেছে দুর্বৃত্তরা।

ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত অভিজাত বিপণী বিতানটির চারটি দোকানে এক রাতেই এমন লুটপাটের পর নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, মার্কেট সমিতির দুর্বল নিরাপত্তার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ীর ভাষ্য, মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী থাকার পরও এমন লুটপাট বড় রহস্যজনক। এতে মার্কেটের কারো হাত থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন।

ঘটনা জানাজানির পর থানা পুলিশ ছাড়াও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে ছুটে যান। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির) ক্রাইমসিন সদস্যরাও আলামত সংগ্রহ করেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের বা পাশে থাকা বাথরুমের গ্রিল ও ফলস সিলিং কেটে দুর্বৃত্তরা ভেতরে ঢুকেছে। এরপর তারা ঘণ্টাখানেক ধরে চারটি দোকানে লুটপাট চালিয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডিবির রমনা বিভাগের ডিসি আজিমুল হক বলেন, ঘটনায় জড়িতরা পেশাদার চোর বা ডাকাত চক্রের সদস্য বলেই মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে এদের চিহ্নিত করতে কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুতই এরা ধরা পড়বে।

রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের একজন কর্মী অমিত সাহা জানান, তারা শনিবার রাতে দোকান বন্ধ করে চলে যান। সকালে দোকান খুলতে এসে দেখেন, সার্টারের কিছুটা খোলা অবস্থায় রয়েছে। সামনেই তালাগুলো এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। ভেতরে ঢুকতেই তারা অবাক হয়ে যান। ডিসপ্লে সেলফে কোনো স্বর্ণালঙ্কারই নেই! পুরো দোকানই তছনছ করা। এরপরই দোকানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে লুটপাটের দৃশ্য দেখতে পেয়ে মালিককে জানান। পাশাপাশি থানাতেও জানানো হয়।

তিনি বলেন, তাদের ডিসপ্লে সেলফ ছাড়াও ড্রয়ারে স্বর্ণালঙ্কার ছিল। মেরামতের জন্য অনেক ক্রেতারও স্বর্ণালঙ্কার ছিল। সব মিলিয়ে তাদের ৫০০ ভরির মতো স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে। ক্যাশে রাখা দুই লাখ টাকাও নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। মার্কেটের কেউ জড়িত না থাকলে এমন ঘটনা সম্ভব নয় বলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের মালিক মহাদেব কর্মকার বলেন, বেশির ভাগ তালাই চাবি দিয়ে খুলে ফেলা হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা আগেই তালাগুলোর চাবি বানিয়েছিল। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় এমন লুট চলেছে। মার্কেটের দায়িত্বে থাকা কারো সহায়তা ছাড়া তো চাবি বানানো সম্ভব নয়। মার্কেটের ভেতরে ও বাইরে সবসময় নিরাপত্তাকর্মীরা থাকে। এত নিরাপত্তার মধ্যেও কীভাবে ডাকাতরা ঢুকলো, মার্কেটের দায়িত্বে থাকা লোকজনের কাছেই এর জবাব রয়েছে।

রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুর্বৃত্তদের হাতে শাবল, স্লাইরেঞ্জ ও হাতুড়ি ছিল। ভেতরে ঢুকেই তারা ব্যাগের মতো কিছুতে স্বর্ণালঙ্কারগুলো ঢুকাচ্ছিল।

ফ্যাশন হাউস জেন্টল পার্কের কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের দোকান থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা লুট হয়েছে। এ ছাড়া ভোগ সুলতানা থেকে ১ লাখ ২২ হাজার টাকা ও মুনসুন রেইন থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো লুট হয়েছে বলে জানা গেছে।

রাপা প্লাজা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোতাহার হোসেন বলেন, নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও মার্কেটে কোনো নিরাপত্তাই নেই। মার্কেটের লোকজন এতে কোনো ভ্রুক্ষেপই করেন না। এজন্যই এমন ঘটনা ঘটতে পারলো। 

রাপা প্লাজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী সাইফুর রহমান বলেন, মার্কেটের বাইরে সবসময় নিরাপত্তাকর্মীরা থাকেন। রাতে সব দোকানকর্মীরা বের হওয়ার পর নিরাপত্তাকর্মীরা মার্কেটটি লক করে দেয়। চোর চক্র গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকেছে। ওই রাতে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের অবহেলা তদন্ত করা হবে।

রাপা প্লাজা মার্কেট কমিটির সহসভাপতি আখতার হোসেন তসলিম বলেন, ২০ বছর আগে মার্কেটটি চালু হয়। আগে কখনো সেখানে চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা অবশ্যই বের করা হবে।

ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া জানান, ওই ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। জুয়েলার্সের মালিক তাদের স্বর্ণের হিসাব-নিকাশ করছেন। তারা মামলা করলে কি পরিমান স্বর্ণালঙ্কার খোয়া গেছে, তা জানা যাবে।

ওসি বলেন, ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে আপাতত তিনজনকে দোকানে ঢুকতে দেখা গেলেও ওই দলে আর কেউ ছিল কি-না, তা যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার রাতে দায়িত্ব পালন করা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে থানায় এনে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।