জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের আট সদস্যকে আদালত যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, সেটি আমাদের জঙ্গিবিরোধী অভিযান এবং অবস্থানের দৃঢ় প্রকাশ। হত্যার পাঁচ বছরের বেশি সময় পর এই রায় ঘোষণা করা হলেও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে আমি মনে করি। এটা স্বস্তির বিষয় যে, দীর্ঘ সময় পর হলেও এ রায় আমরা দেখেছি। আমরা জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মামলায় নানাভাবে দীর্ঘসূত্রতা দেখে আসছি। কোথাও তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার ফলে অনেক আসামি কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়। এর ফলে সাক্ষীরাও নিরুৎসাহিত হন। আবার অনেক আলামত নষ্টও হয়ে যায়। দীপন হত্যা সেদিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এসব মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারের ব্যাপারে অনেকের মনে নেতিবাচক ধারণা জন্মালেও এ রায়ে সরকারের অবস্থানের ইতিবাচক দিকটি উন্মোচিত হলো।
আমরা জানি, দেশের ইতিহাসে যে কয়েকটি উগ্রপন্থি সংগঠন নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের জন্য কুখ্যাত, তার মধ্যে অন্যতম আনসার আল ইসলাম। এটি এক সময় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) হিসেবে পরিচিত ছিল। বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুসহ কয়েকজন লেখক ও মুক্তমনা ব্যক্তির ওপর হামলার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকায় ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে হত্যা করে এ সংগঠনের সদস্যরা। দীর্ঘদিন বাহ্যিক কোনো ভয়ংকর অপারেশন না থাকলেও গোপনে আনসার আল ইসলামের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
আমাদের মনে আছে, ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে দীপনকে খুন করা হয়। এমন ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় দীপনকে খুন করে জাঙ্গিরা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করে। দীপন হত্যার গুরুত্বপূর্ণ এ রায়ে শুরুতেই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটকে ধন্যবাদ দিতে হবে। এ ইউনিটের গোয়েন্দা শাখা ঘটনা উদ্‌ঘাটন করেছে। তারাই বের করেছে কারা এর পেছনে আছে। এটি বের করা সহজ ছিল না। কারণ এরা সংগঠনের নাম বদলায়। অপরাধীরা নানাভাবে নিজেদের ঢাকার জন্য কৌশল করে। তারা এতে সফলও হয়। একই সঙ্গে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা তথা ডিবিকেও ধন্যবাদ। তারা চার্জশিট দেয়। চার্জশিট অনুযায়ী কোর্টে অনেক দিন ধরে শুনানি হয়েছে। আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় হয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণে যথার্থই বলেছেন- লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের হত্যার অংশ হিসেবে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের জন্য দীপনকে হত্যা করা হয়। যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। আদালত আরও বলেছেন, দীপন হত্যাচেষ্টায় অংশগ্রহণকারী অপরাধীরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বাকি সদস্যরাও একই অপরাধ করতে উৎসাহিত হবে। আসামিরা আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসেবে সাংগঠনিকভাবে দীপনকে হত্যাচেষ্টায় অংশগ্রহণ করেছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে আমাদের জঙ্গিবিরোধী জাতীয় অবস্থান আরও দৃঢ় হলো।

বুধবার দীপন হত্যার রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ছয় আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু এ হত্যার মূল হোতা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া ও আকরাম হোসেনকে ধরতে না পারাটা দুঃখজনক। অথচ তারা শুধু দীপনকেই হত্যা করেনি; আরও অনেক নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের ধরতে না পারলে জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন কীভাবে সম্ভব হবে? তারা দীর্ঘদিন পলাতক। তারা যদি বিদেশেও থাকে, তাদেরকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

যারা ইতোমধ্যে জঙ্গি কার্যক্রমে সংশ্নিষ্টতার জন্য জেলে রয়েছে কিংবা যাদের মামলা বিচারাধীন, তাদেরকে কীভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে আনা যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে অনেকেই আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। গত মাসের মাঝামাঝি জঙ্গিবাদের অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে আসা ৯ জনকে র‌্যাব সদর দপ্তরে সাদরে গ্রহণ করা হয়। সরাসরি গ্রেপ্তার অভিযানের পথে না গিয়ে অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহযোগিতা করছে র‌্যাব। 'ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম'কে র‌্যাব বলছে 'নবদিগন্তের পথে' আসা। র‌্যাবের এ উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণ করা উচিত, যাতে অন্যরাও অন্ধকারের পথ থেকে ফিরে আসার পথ খুঁজে পায়। ফিরে আসা জঙ্গিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ সমাজও যাতে তাদের সাদরে গ্রহণ করে, সে জন্য মানুষকে সচেতন করা চাই।
কভিড-১৯ এর এ সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বলে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই এখন অনলাইনে অনেক সময় ব্যয় করছে। সে জন্য সচেতন থাকতে হবে যেন আমাদের সন্তানরা জঙ্গিদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়। আমরা জানি, অনলাইনে জঙ্গিদের প্রচারণা রয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক প্রচারণার অংশও বটে। মুসলমান যুবসমাজ যাতে বিভ্রান্ত না হয় সে জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এর বিপরীতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, ভাবতে হবে। একই সঙ্গে কভিডের সংক্রমণ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাতে খুলে দেওয়া হয়, সে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে আমাদের শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেবে, সংস্কৃতি চর্চা করবে। এগুলোও জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের অংশ।
আমরা জানি, এমন অনেকেই আছেন যারা ওয়াজ মাহফিল, মসজিদ কিংবা ধর্মীয় সমাবেশে সরকারের জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের সমর্থনে কথা বলেন না। এটা নিশ্চিত করতে হবে, সবাই মিলে আমাদের জঙ্গি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সে জন্য ধর্মীয় বক্তাদেরও এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করাতে হবে।
দীপন হত্যা মামলার রায় অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই আমরা দেখি। এর মাধ্যমে সরকার জঙ্গিবিরোধী যে বার্তা দিয়েছে, তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ মামলার রায়ের মতো জঙ্গি-সংশ্নিষ্টতায় বিচারাধীন সব মামলার রায় যেন দ্রুত প্রদান করা হয়। তাতে একদিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোও সন্তুষ্ট হবে। পাশাপাশি, আদালত যেসব মামলার রায় দিয়েছেন তা যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। আমরা চাই, দীপনের এই মামলার রায়ও দ্রুত কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে জঙ্গিবাদমুক্ত একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি।
নিরাপত্তা বিশ্নেষক ও ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

বিষয় : দীপন হত্যার রায়

মন্তব্য করুন