ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ২০২০ সালে যারা মামলা-সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন, গড়ে তাদের ৮০ শতাংশের বেশি সন্তুষ্ট। ডিএমপির 'ইন্টারনাল ওভারসাইট ইউনিট'-এর সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাদীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনটির অনুলিপি সমকালের হাতে এসেছে। সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর ঢাকার ৫০ থানায় ছয় হাজার ৪৩৮টি মামলার বাদীর সঙ্গে ইন্টারনাল ওভারসাইট ইউনিটের সদস্যরা যোগাযোগ করেন। তার মধ্যে পাঁচ হাজার ৬৮৩ জন বাদী পুলিশ সেবায় সন্তোষ এবং ৭৫৫ জন অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ হিসাবে সন্তুষ্টির হার ৮৭ দশমিক ৩৭ এবং অসন্তুষ্টির হার ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট হিসেবে পরিচিত ডিএমপি। সারাদেশের সোয়া দুই লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্যে এই ইউনিটেই রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। ডিএমপিতে থানার সংখ্যা বর্তমানে ৫০টি। ১৯৭৬ সালে ১ ফেব্রুয়ারি যখন ডিএমপির যাত্রা শুরু হয়, তখন ৪১ লাখ নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য ১২টি থানা ও ছয় হাজার জনবল ছিল। এখন বেড়েছে থানার সংখ্যা, বেড়েছে অপরাধের ধরন। প্রতি মাসে শত শত মামলা ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করছেন ভুক্তভোগীরা।

গত ১ ফেব্রুয়ারি ৪৫ বছর পূর্ণ হয়েছে ডিএমপির। আজ শনিবার সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠান করবে। করোনার কারণে এবার আয়োজন কাটছাঁট করা হয়েছে।
ডিএমপির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পুলিশি সেবার ব্যাপারে জিডি-মামলার বাদী পক্ষের অভিযোগ আগের তুলনায় বেশ কমে এসেছে। তবে আগামী দিনগুলোতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিএমপির ইন্টারনাল ওভারসাইট ইউনিটের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মহানগরের আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে সন্তোষের হার সবচেয়ে বেশি, ৯১ শতাংশ। এখানে মামলায় বাদীর অসন্তোষের হার ৯ শতাংশ। এর পর রয়েছে মিরপুর বিভাগ। এখানে সন্তোষের হার ৯০ শতাংশ, অসন্তোষ ১০ শতাংশ। গুলশান বিভাগে সন্তোষের হার ৮৯ শতাংশ, অসন্তোষ ১১ শতাংশ। রমনা বিভাগের মামলায় বাদীর সন্তোষের হার ৮৯ শতাংশ, অসন্তোষ ১১ শতাংশ। মতিঝিলে সন্তোষের হার ৮৮ শতাংশ ও অসন্তোষ ১২ শতাংশ। উত্তরায় সন্তোষ ৮৮ শতাংশ ও অসন্তোষ ১২ শতাংশ। ওয়ারীতে সন্তোষের হার ৮৫ শতাংশ, অসন্তোষ ১৫ শতাংশ। সন্তোষের হার সবচেয়ে কম লালবাগে। তবু ৮০ শতাংশের কাছাকাছি, ৭৯ শতাংশ। অসন্তোষ ২১ শতাংশ। ২০২০ সালে জিডি করেছেন এমন ৩৯ হাজার ৪৮৭ জনের মতামত নেয় 'ইন্টারনাল ওভারসাইট ইউনিট'। তার মধ্যে দুই হাজার ৩৫৭ জন অসন্তুষ্ট। শতকরা হিসাবে ৯৪ দশমিক ০৩ ভাগ মানুষ সন্তুষ্ট; ৫ দশমিক ৯৭ ভাগ বাদী অসন্তুষ্ট।

প্রতিবেদন মতে, গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুই হাজার ৩৯২ জনের মধ্যে ২৪ জন বাদে সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছে।

পুলিশ বলছে, সেবাপ্রত্যাশীরা সংশ্নিষ্ট যেসব কর্মকর্তার কারণে অসন্তুষ্ট হয়েছেন সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।

ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, গত বছর ৩৫ হাজার ৪৪৭ জন পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে ডিএমপির ওয়ানস্টপ ক্লিয়ারেন্স শাখায় আবেদন করেন। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৫৭৩ জন অর্থাৎ ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ মানুষ সেবা পেয়েছেন। আবেদনপত্রে ভুলত্রুটির কারণে সাত হাজার ৮৭৪ জন অর্থাৎ ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, পাঁচটি কারণে ২২ ভাগ মানুষ পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্সে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। এক. আবেদনকারীর পাসপোর্টের ফটোকপি সত্যায়িত না থাকা। দুই. পাসপোর্টের ঠিকানা ডিএমপি এলাকার আওতাভুক্ত না হওয়া। তিন. পাসপোর্টে উল্লেখিত ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র না থাকা। চার. পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকা। পাঁচ. অস্পষ্ট পাসপোর্ট কপি।

আবেদনকারীর পাসপোর্টের ফটোকপি সত্যায়িত না থাকায় ১০ দশমিক ৪৪, পাসপোর্টের ঠিকানা ডিএমপি এলাকার আওতাভুক্ত না হওয়ায় ২ দশমিক ৬৪, পাসপোর্টে উল্লেখিত ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র না থাকায় ৬ দশমিক ৮৪, পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকায় শূন্য দশমিক ৭৮ এবং অস্পষ্ট পাসপোর্ট কপির জন্য ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ গ্রাহক পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সেবা পাননি।

করোনা সংক্রমণের পর গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে সাইবার অপরাধের অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও পর্নোগ্রাফি আইনে ২৫৬টি মামলা হয়েছে। আগের বছর একই সময় একই ধারায় মামলা হয় ২৩৬টি। এই হিসাবে করোনাকালে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। এমন চিত্র সারাদেশেও। গত বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয় এক হাজার ১৩৫টি। ২০১৯ সালে একই সময় একই ধারায় মামলা হয়েছিল ৮৭৯টি।

ডিএমপির অপরাধ বিভাগের একজন ডিসি সমকালকে জানান, থানার অধিকাংশ জনবল সাইবার অপরাধ তদন্তে পারদর্শী নন। অনেকের ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট নেই। তার প্রশ্ন, তাহলে থানার ওই সদস্য কীভাবে সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করবেন। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় থানা পুলিশের সদস্যদের যুগোপযোগী করে তোলা জরুরি।

ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাপী নানামুখী সাইবার অপরাধ বাড়ছে। দিনে রাজধানীতে সাত-আটটি অভিযোগ পাচ্ছি। ডিএমপিতে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আলাদা ইউনিট রয়েছে। তবে তা বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। থানা পুলিশের সদস্যরা যাতে সাইবার অপরাধের তদন্তে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। প্রত্যেক থানার অর্ধেক জনবলকে সেভাবে প্রস্তুত করার পরিকল্পনা আছে। এরই মধ্যে সব থানার একজন করে অফিসারকে সিআইডির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।