লেখক মুশতাক আহমেদের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স যখন রাজধানীর লালমাটিয়ায় পৌঁছায়, বাসাজুড়ে বিষণ্ণতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন স্ত্রী লিপা আক্তার, কারাগারে মারা যাওয়া লেখকের স্ত্রী। কাঁদতে কাঁদতে তিন শব্দই বারবার বলতে থাকেন, 'এটা কী হলো?'

ছয়বার আবেদন করেও জামিন না হওয়ায় লিপা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শুক্রবার মুশতাকের মরদেহ বাসায় নেওয়া হলে তাকেও হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়া হয়। বিলাপ করে তিনি বলছিলেন, গত ১০ মাসে একবারের জন্যও তার সঙ্গে মুশতাকের দেখা হয়নি। গত মঙ্গলবার তাকে নিম্ন আদালতে হাজির করা হলে তিনি যেতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে যেতে পারেননি। যারা আদালতে মুশতাকের সঙ্গে দেখা করেছেন, সবাই বলল ও ভালো আছে।

শুক্রবার বিকেল পর্যন্তও লিপা জানতেন মুশতাক সুস্থ আছেন। তিনি বলেন, 'সব সময়ে নানা মাধ্যমে স্বামীর খোঁজ রাখার চেষ্টা করতাম। কাল (বৃহস্পতিবার) বিকেল পর্যন্ত জেনেছিলাম ও সুস্থ আছে। সুস্থ লোকটাকে এভাবে মরতে হলো?'

স্বজনরাও জানান, কারাগারে যাওয়ার পর মুশতাক বিষণ্ণ ছিলেন। তবে মৃত্যু হওয়ার মতো এমন অসুস্থ তিনি ছিলেন বলে তাদের জানা ছিল না। কারা কর্তৃপক্ষ বা কেউ তাদের সেটা জানায়নি। একমাত্র সন্তান মুশতাককে হারিয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছেন তার বৃদ্ধ বাবা আবদুর রাজ্জাক ও মা জেবুন্নেসা রাজ্জাকও। চোখের সামনে ছেলের নিথর দেহ দেখে আক্ষেপ করতে থাকেন তারা।

গত বছরের ৪ মে রাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে মুশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। ওই মামলায় জানুয়ারির শুরুর দিকে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে। কয়েক দফা আবেদন করা হলেও ওই লেখকের জামিন মেলেনি। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি মুশতাক শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। সেখানেই ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে তার মরদেহ লালমাটিয়ার বাসায় নেওয়া হয়।

লিপা আক্তার বলেন, 'মুশতাকের সঙ্গে দেখা না হলেও দিন ১৫ আগে মোবাইল ফোনে কয়েক মিনিট কথা হয়েছিল। তখন ও বলল, ভালো আছে। কোনো সমস্যা নেই। কারাগারে বসে থাকতে থাকতে ওর একটা ছোট ভুঁড়িও হয়েছে, যেটা এর আগে ছিল না।'

স্বামীর লাশের কফিন দেখে স্বজনের কাঁধে ভর করে বাসায় ওঠেন লিপা। ড্রয়িংরুমে বসে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে তোলা দু'জনের ছবি দেখিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন তিনি। ১৫ বছরের সংসারে এই ছবি আর মুশতাকের নানা লেখালেখির স্মৃতি নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে হবে তাকে।

জানাজা ও দাফন : শুক্রবার রাতে লালমাটিয়া সি-ব্লকে মিনার মসজিদের সামনে মুশতাক আহমেদের জানাজা হয়। এতে তার আত্মীয়স্বজনরা ছাড়াও বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নেন। পরে মুশতাক আহমেদের মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গতকাল বিকেলে শাহবাগে মুশতাক আহমেদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

মন্তব্য করুন