রাজধানীর মালিবাগে 'হলি লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে' নির্যাতনে ইয়াসিন ওয়াহিদ (১৯) নামে চিকিৎসাধীন এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। 

মঙ্গলবার দুপুরে নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন তাকে খিদমাহ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ইয়াসিন গত বছর এসএসসি পাস করেছিলেন। মানসিক সমস্যা নিয়ে গত ২২ জানুয়ারি তাকে ওই নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল।

ওই নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনের দাবি- ইয়াসিন বাথরুমে আত্মহত্যা করেছেন। তবে তরুণের স্বজনদের অভিযোগ- নির্যাতন করে হত্যার পর আত্মহত্যার প্রচার চালানো হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ সেখান থেকে চারজনকে আটক করে হাতিরঝিল থানায় নিয়েছে।

ইয়াসিনের এক স্বজন জানান, ছেলেটি পরিবারের কাছে নানা আবদার করতেন। না দিলেই উল্টাপাল্টা আচরণ করতেন। এরপর মালিবাগের ডিআইডি রোডের ওই নিরাময় কেন্দ্রে তাকে ভর্তি করা হয়। এরপর ইয়াসিনের বাবা মাসুদ মিয়া দুই দফা ছেলেকে দেখতে গেলেও 'বড় হুজুরের' অনুমতি নেই জানিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো হয়।

মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনই তাকে ডেকে নেন। তখন দেখেন অচেতন ইয়াসিনকে ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নামানো হচ্ছে। পরে তাকে খিদমাহ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ইয়াসিনের বাবা মাসুদ মিয়া সমকালকে বলেন, তার ছেলে মাদকাসক্ত ছিল না। উল্টাপাল্টা আচরণের কারণে আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে তাকে মানসিক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় সেখানকার লোকজন জানিয়েছিল, চিকিৎসার পাশাপাশি ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্য তারা মাসে ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিল। তবে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার চুক্তি হয়। গত বৃহস্পতিবারও তিনি ছেলেকে দেখতে গিয়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন। কিন্তু বড় হুজুরের অনুমতি নেই জানিয়ে টাকা রেখে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগেও তিনি ইয়াসিনকে দেখতে গেলে তাকে ফেরত পাঠানো হয়।

তার দাবি, ছেলেকে তখনই নির্যাতন করে আহত করা হয়েছিল। এ জন্য তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। মঙ্গলবারও নির্যাতন করে মেরে ফেলার পর তাকে খবর দেওয়া হয়।

অবশ্য হলি লাইফ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ইয়াজ উদ্দিন সমকালকে বলেন, ইয়াসিন নামের ওই রোগী সব সময়ে উত্তপ্ত আচরণ করত। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাত। মঙ্গলবার সকালে সে বাথরুমে যায়। দীর্ঘক্ষণেও বের না হলে দায়িত্বরত লোকজন গিয়ে দেখে গামছা পেঁচিয়ে সে পড়ে আছে। এরপর তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তার দাবি- ইয়াসিন গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু 'আত্মহত্যার' প্রবণতা রয়েছে- এমন রোগীর কাছে গামছা দেওয়া হলো কেন এবং শরীরে আঘাতের চিহ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে পরে কথা বলবেন বলে তিনি এড়িয়ে যান। তবে তিনি স্বীকার করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে 'দ্বীনের আলোকে' মানসিক ও মাদকাসক্তির চিকিৎসা দেওয়া হতো।

ওই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া এক ব্যক্তি কয়েকদিন আগে জানিয়েছিলেন, সেখানে বিভিন্ন সেলে আসামিদের মতো বন্দি করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় গুঁজে ও স্কচটেপ লাগিয়ে মারধর করা হয়। বহুদিন ধরে তাকে আটকে নির্যাতন করা হলেও গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তার মায়ের মৃত্যুর কারণে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি নিরাময় কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।

চিকিৎসা নেওয়া ওই ব্যক্তি বলেন, জিডির পর পুলিশের কোনো তৎপরতা না দেখে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি এখন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।

এর আগে গত বছরের নভেম্বরে মোহাম্মদপুরে মাইন্ডএইড নামে একটি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান এএসপি আনিসুল করিম। পরে ওই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হয়।

হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মহিউদ্দিন ফারুক জানান, খবর পেয়ে তারা ইয়াসিনের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছেন। নিরাময় কেন্দ্র থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই করা হচ্ছে। সেখান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে ওই তরুণের মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

ইয়াসিনের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বড়পাশা গ্রামে। তিনি পরিবারের সঙ্গে মেরুল বাড্ডা এলাকায় থাকতেন। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট।