প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সদস্যরা শুনেছিলেন, রাজধানীর হাতিরঝিলের আমবাগান এলাকায় গতকাল শনিবার সকালে একটি ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের ওপর উঠে যায়। এতে রাজধানীর গুলশানের বাসিন্দা ধনাঢ্য ব্যবসায়ীপুত্র সাকিবুল আলম মিশু (৩৪) ও তার স্ত্রী হাসনা হেনা ঝিলিক (২৫) মাথায় গুরুতর আঘাত পান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে এলে চিকিৎসক ঝিলিককে মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় চিকিৎসক ও পুলিশের কাছে মিশু দাবি করেন, করোনায় আক্রান্ত স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে হাসপাতালে নেওয়ায় সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তারা।

তবে নিহতের শারীরিক আলামত পরীক্ষা করে চিকিৎসক তখনই বলেন, 'সড়ক দুর্ঘটনা নয়, ওই নারীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হলে যে ধরনের লক্ষণ দেখা যায়, এখানে সে ধরনের লক্ষণ আছে। এ ছাড়া তার শরীরে আরও আঘাতের চিহ্ন আছে। দুর্ঘটনার যে সময় বলা হচ্ছে, ওই নারী মারা গেছেন তারও অনেক আগে।'

চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন অভিমত পাওয়ার পরপরই নড়চড়ে বসে পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল থেকেই আটক করা হয় মিশুকে। এরপর বেরিয়ে আসে পারিবারিক কলহের জের ধরে আগেই স্ত্রীকে হত্যা করে লাশ জিপ গাড়িতে নিয়ে ঘুরছিলেন মিশু। স্ত্রীর লাশ পেছনের সিটে বসিয়ে রেখে পরিকল্পিতভাবে হাতিরঝিলে গিয়ে দুর্ঘটনার নাটক সাজান।

গতকাল রাতে এ ঘটনায় ঝিলিকের মা বাদী হয়ে গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মিশু ও তার মা-বাবা, ছোট ভাই ও তার স্ত্রীকে আসামি করা হয়। রাতে মিশু ও তার মা-বাবাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সমকালের হাতে আসা মিশুর গুলশানের বাড়ির একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার সকাল ৯টা ৮ মিনিটে বাড়ির দারোয়ান, ম্যানেজার ও দুই গৃহকর্মী মিলে ধরাধরি করে ঝিলিককে নামাচ্ছে। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীর সাদা কাপড়ে মোড়ানো। ফুটেজে দেখা যায়, একটি নিথর দেহ নামিয়ে গাড়িতে তোলা হয়।

লাশ নামিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে রাখার প্রমাণও পাওয়া যায় মিশুদের গুলশানের ২ নম্বরের ৩৬ নম্বর সড়কের ২২/সি বাড়ির ম্যানেজার আবু তাহেরের কথায়। তিনি বলেন, 'মিশু স্যারের স্ত্রীকে ধরাধরি করে দোতলা থেকে নামানোর সময় তিনি নড়াচড়া করছিলেন না। দুজন বুয়া সামনে থেকে আর আমরা দুজন পেছন থেকে ধরে নিথর দেহটি গাড়িতে তুলে দেই। তখন তার কোনো সাড়াশব্দও পাওয়া যায়নি।'

হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মহিউদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। এরপর আহতদের হাসপাতালে নেন পুলিশ সদস্যরা। মিশু দাবি করেন, তিনি তার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পরে তারা জানতে পারেন ঘটনাটি রহস্যজনক। গুলশান থেকে মৃত অবস্থায়ই ঝিলিককে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। মিশুর বাসা গুলশানে হওয়ায় বিষয়টি গুলশান থানার ওসিকে জানানো হয়। তাকেও তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ চক্রবর্তী সমকালকে জানান, এরই মধ্যে বাড়ির একাধিক বাসিন্দা ও মিশুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গৃহকর্মীরা জানান, শুক্রবার রাতে স্বামী-স্ত্রীর প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি তাতে মনে হচ্ছে, হত্যা করে দুর্ঘটনা বলে সাজানোর চেষ্টা করা হয়। মিশু মাদকাসক্ত। নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে তাকে ভালো পথে আনার চেষ্টা করাও হয়েছিল।

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বাচ্চু মিয়া জানান, ওই নারীর পা, মাথা ও গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে।

গুলশানের নিজেদের ফ্ল্যাটে মিশু, তার ব্যবসায়ী বাবা জাহাঙ্গীর আলম, মা সাইদা আলম, ছোট ভাই ফাহিম আলম ও ফাহিমের স্ত্রী বসবাস করেন। বাসায় সার্বক্ষণিক থাকেন দু'জন গৃহকর্মী। ঝিলিকের পরিবারের লোকজন জানান, তার বাবা আনোয়ার হোসেন খান কয়েক মাস আগে মারা যান। ঝিলিকরা তিন বোন ও এক ভাই। বোনদের মধ্যে ঝিলিক ছোট। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং। তবে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে তারা ৩০ বছর ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।

ঝিলিক মোহাম্মদপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে মিশুর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় তার। পরে প্রেম হয়। মিশু বাবা-মায়ের কাছে পছন্দের বিষয়টি জানালে তারা ঝিলিকের পারিবারিক বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে বিয়েতে অমত দেন। কারণ, ঝিলিক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

অন্যদিকে মিশু ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। মিশু তাকে ছাড়া অন্য মেয়েকে বিয়ে করবেন না বলে জানিয়ে দেন। একপর্যায়ে ছেলের জেদের কাছে হার মানেন তারা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের পর মিশুদের বাড়িতেই ওঠেন ঝিলিক। কয়েক মাস তারা ভালোই ছিলেন। ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকে শুরু হয় অশান্তি।

ঝিলিকের মা তহমিনা হোসেন আসমা জানান, বিয়ের পর মিশুর বাবা-মা ও ভাইবোন নির্যাতন শুরু করেন। উঠতে-বসতে তারা ঝিলিককে 'গরিবের মেয়ে' বলে গালমন্দ করতেন। নির্যাতনও করা হতো।

গতকাল সন্ধ্যায় গুলশান থানায় বসে এসব কথা বলার সময় অঝরে কাঁদছিলেন বৃদ্ধা তহমিনা। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, 'আমরা গরিব। বিয়ের পরপর দু-একবার গিয়েছি ঝিলিকের শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবর খারাপ আচরণ করতেন। কেন ওই বাসায় পা রেখেছি- এটা শুনিয়ে আজেবাজে কথা বলতেন তারা। এ আচরণে তাদের বাড়ি আর যাইনি আমরা।'

তহমিনা জানান, ২০১৯ সালের জুনে ঝিলিককে মারধর করে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি একাই তাজমহল রোডে বাবা-মায়ের বাসায় ওঠেন। কয়েকদিন পর মিশু যান সেখানে। প্রায় দেড় মাস থাকেন তাদের বাসায়। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময় মিশুর মা তাকে ফোন করে বাসায় চলে আসতে বলতেন। আগস্টের শুরুর দিকে মিশুকে জোর করে গুলশানের বাসায় নিয়ে আসা হয়। তখন খিলগাঁওয়ের একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হয় তাকে। কয়েক দিন স্বামীর ফোনে সাড়া না পেয়ে ঝিলিক গুলশানে শ্বশুরবাড়িতে আসেন। কিন্তু শাশুড়ি তাকে বাসায় ঢুকতে দেননি। ফিরে যান বাবার বাসায়। কয়েক দিন পর আবার গুলশানে আসনে। সেদিনও বাসায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

সেদিন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে '৯৯৯'-এ ফোন দিয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান ঝিলিক। গুলশান থানা পুলিশ সেখানে যায়। তবে শাশুড়ির বাধার মুখে তাকে বাসায় ঢোকাতে পারেনি পুলিশও। পরে পুলিশের মাধ্যমে স্বামীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের ঠিকানা নিয়ে তাজমহল রোডের বাসায় ফেরেন তিনি। ২৪ দিনের মাথায় তিনি নিরাময় কেন্দ্র থেকে স্বামীকে নিয়ে আসেন বাবার বাসায়। সেখানে দুই মাস ছিলেন তারা। এরই মধ্যে ঝিলিক অন্তঃসত্ত্বা হন। একপর্যায়ে আবার জোর করে মিশুকে গুলশানে নিয়ে আসেন বাবা-মা। পরে ঝিলিক সেই বাসায় গেলে দেবর ফাহিম জানান, তার ভাই তাকে তালাক দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি বাবার বাসায় ফিরে যান।

জানুয়ারি মাসে লালমাটিয়ায় একটি মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে মহিলা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন ঝিলিক। তাদের মধ্যস্থতায় ২০২০ সালের মার্চে ঝিলিককে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বছরের জুলাইয়ে তাদের ছেলেসন্তান হয়। কোলে ৯ মাসের দুধের সন্তান থাকার পরও ঝিলিকের ওপর নির্যাতন থামেনি বলে অভিযোগ করেন তহমিনা। তিনি বলেন, প্রায়ই তার মেয়েকে নির্যাতন করা হতো। গত ২৯ মার্চ তার সঙ্গে মেয়ে ফোনে কথা বলে। এরপর তিনি ফোন দিলেও ঝিলিক ধরত না। অবশ্য তারা মিশুদের বাড়ি আসার সাহসও করেননি খোঁজখবর নিতে।

তহমিনার অভিযোগ, তার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, গতকাল শনিবার সকাল ৮টার দিকে মিশু তাকে মেয়ের মৃত্যুর খবর দেয়। লাশ কোথায় রয়েছে- এটা জানতে চাইলে সে স্পষ্ট কিছু বলছিল না। পরে জানতে পারেন, হাতিরঝিলের দুর্ঘটনার সাজানো গল্প।

তহমিনা জানান, মাদকাসক্ত হওয়ায় তার জামাই তেমন কিছু করত না। ঝিলিক ঘর-সংসার নিয়ে থিতু হতে চেয়েছিল। এ কারণে বারবার নির্যাতন করলেও স্বামীর সংসারে পড়ে থাকার চেষ্টা করেছিল।