করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সোমবার থেকে সারাদেশে শুরু হয়েছে লকডাউন। কিন্তু রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সামাজিক দূরত্বের অনুপস্থিতি ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে লকডাউনের প্রথম দিনে।

গত বছর লকডাউনের সময় বাজারের প্রবেশমুখে জীবাণুনাশক ও তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা ছিল। এবার এই ব্যবস্থা কোথাও দেখা যায়নি। বাজারে আসা মানুষজনের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়নি। সব মিলিয়ে কাঁচাবাজারগুলোতে করোনাবিধির বালাই ছিল না।

গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরুর পরে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিল মার্কেট কর্তৃপক্ষ। দোকানের সামনে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করার পরিসর আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাছাড়া বিক্রয়কর্মীদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দোকানের কাউন্টারসংলগ্ন এলাকা দড়ি দিয়ে ঘেরানো ছিল।

কিন্তু সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এবার স্বাস্থ্যবিধি মানতে সরকার একই নির্দেশনা দিলেও তা ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই মানছেন না। কোনো কোনো ক্রেতা স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী চলার চেষ্টা করলেও অন্যদের কারণে পারছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে একটু সতর্কতা দেখালেও তারা চলে যাওয়ার পর কেউই কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না।

করোনা মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজারের জন্য দেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাজারের প্রবেশমুখে তাপমাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে মাস্ক বাধ্যতামূলকভাবে পরতে হবে। বাজারের কসাইখানা ও প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। বাজার বন্ধের পর জীবাণুমুক্ত করতে হবে। কেনাকাটার সময় অবশ্যই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

সোমবার মিরপুর-১নং কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতার ভিড়। বাজারের মধ্যে যেমন, তেমনি সিটি করপোরেশন মার্কেটের সামনের সড়কের সবজির দোকানেও বালাই নেই সামাজিক দূরত্বের। কোনো কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা মাস্ক পরলেও অধিকাংশেরই তা ছিল না। অনেকে মাস্ক হাতে, থুতনিতে কিংবা গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।

বাজারে আসা ক্রেতা শফিকুল ইসলামের কাছে মাস্ক না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি করে বাজারে এসেছেন। তাই মাস্ক আনতে ভুলে গেছেন। মাস্কপরা আরেক ক্রেতা মো. লিটন বলেন, মহামারির এখন চরম খারাপ সময়। অথচ অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বাজারে কেনাকাটা করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ক্রেতা আসছেন। তাদের সবাইকে তো আর বলে বলে স্বাস্থ্যবিধি মানানো সম্ভব নয়। ক্রেতারা নিজেরাই সচেতন হয়ে কেনাকাটা করলে অনেকটা মানা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। বাজারে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা না করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি মার্কেট কমিটি ভালো জানে।

মাস্ক না পরা বা সামাজিক দূরত্ব না মানার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তবে নির্ধারিত সময়ে মার্কেট বন্ধ করতে তৎপর ছিল তারা।

কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, খিলগাঁও, তেজগাঁওয়ের কলমিলতা ও মগবাজার কাঁচাবাজারেও ছিল একই অবস্থা। দুই সিটির ২৮টি কাঁচাবাজারের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো বাজারেই স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগে কড়াকড়ি ছিল না।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় সোমবার ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে লকডাউন দিয়েছে সরকার। এ সময় শুধু জরুরি সেবা ছাড়া প্রায় সবকিছু বন্ধ থাকবে। লকডাউন ঘোষণার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান এবং কাঁচাবাজার বা উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনা-বেচা করা যাবে। 

খাবারের দোকান ও হোটেল রেস্তোরাঁয় কেবল খাদ্য বিক্রি বা সরবরাহ করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়া যাবে না। শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে। তবে দোকান, পাইকারি ও খুচরা পণ্য অনলাইনে কেনাবেচা করতে পারবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই কর্মচারীদের মধ্যে আবশ্যিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং কোনো ক্রেতা সশরীরে যেতে পারবেন না।

তবে এসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কা কেউই করছেন না। নিত্যপণ্যের বাজারে আগের দিনের চেয়ে আরও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। গত দুই দিনে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ ৩৮ থেকে ৪০ টাকা হয়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে আদার দাম সোমবার কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। এখন আমদানি করা ভারতীয় আদা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। 

চড়া মুরগির দাম সামান্য কমলেও লকডাউন ঘোষণার পরে আবার বেড়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হয় ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায়। লেয়ার মুরগি ২০০ থেকে ২৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকায়।

এদিকে লকডাউনে বড় বড় মার্কেট ও প্রধান সড়কে দোকানপাট বন্ধ ছিল। এসব দোকান চালু করতে নিউমার্কেট, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে খোলা ছিল সব ধরনের দোকান। রাজধানীর মিরপুর, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, মানিকনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।

মন্তব্য করুন