বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা রাজধানীর সদরঘাটের ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লি। গেঞ্জি, প্যান্ট, সালোয়ার-কামিজ, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, ফতুয়া- কী নেই এখানে! তৈরি হয় সব ধরন ও বয়স অনুযায়ী নানা রকমের পোশাক। বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডের ডিজাইন-মানও অনুকরণ করা হয়। দেশের পোশাকের বাজারের বড় সরবরাহ হয় এখান থেকেই। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী-ক্রেতাদের আনাগোনা থাকে বছরজুড়ে। অবশ্য সারাবছরের ৬০-৭০ শতাংশ বেচাকেনা হয় ঈদের আগে।
করোনাভাইরাসের প্রকোপে লকডাউন পরিস্থিতিতে গত বছর এখানকার ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়ে। ঈদুল ফিতরের আগেই বন্ধ হয়ে যায় মার্কেট। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর গতবারের ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের বাজার ধরতে গত কয়েক মাস কারখানাগুলোর মেশিন সচল ছিল রাতদিন। এরই মধ্যে সোমবার থেকে এক সপ্তাহের লকডাউনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। পুরো পল্লিতে এখন পুঁজি হারানোর আক্ষেপ, বেকারত্বের শঙ্কা, ঋণের বেড়াজালে আটকে থাকার ভয়। সোমবার কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লি ঘুরে এমন হতাশার চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগর, আগানগর ছোট মসজিদ রোড, চর কালীগঞ্জ এলাকায় চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই পোশাকপল্লিতে ছোট ও মাঝারি আকারের ছয় হাজারের মতো কারখানা আছে। দোকানের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে আনুমানিক এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয় এখানে। মূলত শবেবরাত থেকে শুরু করে ২৫ রমজান পর্যন্ত পাইকারদের ভিড় থাকে। বছরের অন্যান্য সময় দিনে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার পাইকারি ব্যবসায়ী আসেন। তবে রমজান মাসে তা বেড়ে দৈনিক আট-দশ হাজারে দাঁড়ায়। তাদের ভাষ্য, গত বছর লকডাউনে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ওই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার নিষেধাজ্ঞা। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এবার পোশাক তৈরি করেছেন তারা। এখন ঈদে বিক্রি করতে না পারলে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।
কেরানীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের তানিশা গার্মেন্টের মালিক বিল্লাল হোসেন জিন্স প্যান্ট পাইকারি বিক্রি করেন। তার নিজস্ব কারখানাও রয়েছে। গত বছর ঈদ ও পহেলা বৈশাখের জন্য ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সাত কোটি টাকার প্যান্ট উৎপাদন করেন তিনি। এখনও তিন কোটি টাকার প্যান্ট রয়ে গেছে। যেগুলো বিক্রি হয়েছে, সেগুলোতেও গুনেছেন লোকসান। এবার বাংলা নববর্ষ ও ঈদ সামনে রেখে নতুন করে প্রস্তুতি নেন বিল্লাল হোসেন। তবে সাম্প্রতিক আরোপিত লকডাউনের ফলে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।
কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুসলিম ঢালী সমকালকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে গত বছর ২৫ মার্চ থেকে লকডাউনে ছিল কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টপল্লি। ১০ মে রোজার ঈদের পর গার্মেন্টপল্লি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারের নির্দেশে চালু হয়। তবে মার্কেট খুললেও বেচাকেনা তেমন ছিল না। গত বছরের হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য রয়ে গেছে। এবারও নতুন করে কিছু পণ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে হঠাৎ দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় লোকসান গুনতে হবে। তিনি সীমিত পরিসরে দোকান খোলা রাখার দাবি জানিয়ে বলেন, সময় বেঁধে দিয়ে হলেও দোকান খোলা রাখা দরকার।
কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি স্বাধীন শেখ বলেন, কম-বেশি প্রায় প্রতি মাসেই লোকসান গুনতে হয় এখানে। রোজার ঈদের আগে দুই মাস ব্যবসা করে সারা বছরের লোকসান মিটিয়ে মুনাফা হয় তাদের। গত শনিবার থেকে সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার ঈদ মৌসুম ভেস্তে যাবে।
ধানসিঁড়ি ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন বলেন, ঈদ ঘিরে পোশাক তৈরি হয়ে গেছে। ব্যবসা বন্ধ থাকায় এখন এসব পোশাক আমাদের গলার ফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সব নিয়ম মেনেই ব্যবসা করছি। অথচ এই লকডাউনের কোনো দরকার ছিল না।
লক্ষ্মীপোলা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাকের চাহিদা মেটানো হয়। ঈদে চাহিদা অনুযায়ী ধার-দেনা করে পোশাক বানিয়েছি। এখন সবাই পাওনা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। বিক্রি নেই; টাকা দেব কীভাবে?

মন্তব্য করুন