করোনার মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল জনশক্তি খাত। প্রায় ছয় মাস পুরোপুরি ও আংশিক বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেড় লাখের বেশি কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। কিন্তু দেশে বাড়তে থাকা করোনা সংক্রমণ রোধে আজ বুধবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এক সপ্তাহের 'সর্বাত্মক' লকডাউনে আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তে জনশক্তি খাতে ফের তালা পড়ছে। বিদেশগামী যেসব কর্মী আগামী দিনগুলোর বিমানের টিকিট কেটেছিলেন, তাদের বিদেশযাত্রা ও চাকরি দুই-ই অনিশ্চিত।
অনিশ্চয়তায় পড়া কর্মীদের একজন কাতার থেকে দেশে এসে আটকেপড়া ইসমাইল হোসেন রনি। তিনি বলেছেন, অনেকেই ১৩-১৪ মাস আটকে থাকার পর কর্মস্থলে ফেরার অনুমতি পেয়েছেন। রি-এন্ট্রি ফি, টিকিট খরচ এবং কাতার গিয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হোটেল বুকিং বাবদ এরই মধ্যে লাখ তিনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। এই লকডাউনের মধ্যে যাদের ফ্লাইট, তারা যেতে না পারলে হোটেল বুকিংয়ের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। আর রি-এন্ট্রির মেয়াদ মাত্র ৩০ দিন। এ সময়ের মধ্যে যেতে না পারলে আর বিদেশ যাওয়াই হবে না।
রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলো গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লাইট চালু রাখার দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছে, ২০ হাজারের বেশি কর্মীর বিমানের টিকিট কাটা রয়েছে। যাদের আগামী আট দিনে দেশ ছাড়ার কথা ছিল, ফ্লাইট বন্ধের কারণে তাদের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত। এতে এজেন্সি ও কর্মী আর্থিক ক্ষতিতে পড়বে।
করোনার কারণে গত বছরের মার্চের মাঝামাঝিতে বিদেশে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। দেশে এসে আটকা পড়েন অন্তত আড়াই লাখ কর্মী, যাদের বড় অংশ পরবর্তী সময়ে ফেরত গেলেও একটি অংশ চাকরি হারিয়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে ফেরত এসেছেন আরও প্রায় তিন লাখ কর্মী। সব প্রক্রিয়া শেষ করে লাখখানেক কর্মীর গত বছর বিদেশ যাওয়া আটকে যায় বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকায়। জুলাই থেকে পরের চার মাসে হাতেগোনা কিছু কর্মী বিদেশ গেলেও নভেম্বর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে।
গত বছরের শেষ দুই মাসে ৩৪ হাজার ৯৬৮ কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে জনশক্তি খাত। জানুয়ারি মাসে ৩৫ হাজার ৭৩২ জন ও ফেব্রুয়ারিতে ৪৯ হাজার ৫১০ কর্মী বিদেশ গিয়েছেন।
আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া 'সর্বাত্মক' লকডাউনে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে ফের ধসের আশঙ্কা করছেন কর্মী ও এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা সমকালকে বলেছেন,

আগেরবার নিয়োগকারী দেশগুলো বিমান চলাচল বন্ধ করেছিল। তাই যেতে না পারা কর্মীরা কারণ দেখাতে পেরেছেন। কিন্তু এবার বাংলাদেশে বিমান চলাচল বন্ধ করায় নিয়োগকারীকে দেশকে দায় দেওয়া যাবে না। নির্ধারিত সময়ে যেতে না পারার কারণে কোনো কর্মী চাকরি হারালে বা কর্মসংস্থান না হলে এর দায় কে নেবে?
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন হাজারো কর্মী বিদেশ যাচ্ছেন। তাই আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল বন্ধ করা উচিত নয়। যারা বিদেশ যাচ্ছেন, তারা করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বিশেষ বিমান দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একবার যাওয়া পিছিয়ে গেলে তারা সংকটে পড়বেন।
রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো এরই মধ্যে অনেক বিনিয়োগ করেছে। কর্মী যেতে না পারলে তাদের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা পড়বে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের কারণে ঢাকায় সৌদি দূতাবাস ভিসা সত্যায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। পাসপোর্ট জমা নিচ্ছে না। আরব আমিরাত পর্যটন ভিসায় গিয়ে কাজের অনুমতির (ওয়ার্ক পারমিট) জন্য আবেদনের সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোজই অনেক কর্মী যাচ্ছে। এ ছাড়া ওমান, সিঙ্গাপুরে দিনে শতাধিক কর্মী যাচ্ছেন।
বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিদেশ যেতে অপেক্ষায় থাকা কর্মীরা বিপাকে পড়বেন বলে জানিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। সংবাদ সম্মেলনে বায়রার সদ্য সাবেক সচিব ফখরুল ইসলাম বলেছেন, এ মুহূর্তে ২০ থেকে ৩০ হাজার কর্মী উচ্চ মূল্যে বিমান টিকিট কেটে বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। আরও অনেকে টিকিটের জন্য অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। লকডাউনে যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে গার্মেন্ট ও কারখানা খোলা রাখা যায়, তাহলে বিমান কেন চালু রাখা যাবে না কেন?
ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব সভাপতি মনসুর আহমেদ কালাম পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আগামী আট দিনে যাদের বিদেশ যাওয়ার বিমানের টিকিট কাটা ছিল, তাদের অনেকের ভিসার মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হবে। তারা কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে ভিসা বাতিল ও চাকরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেনি। ফলে নিয়োগকারীরা কর্মীদের আটকেপড়ার যুক্তি মানতে চাইবে না।
আটাব মহাসচিব মাজহারুল হক ভূঁইয়া, হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন তসলিমসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে।

মন্তব্য করুন