রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে রাস্তায় নামার পরই একটি মাইক্রোবাসে অজ্ঞাত কয়েকজন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাব্বী হোসেন শুভকে তুলে নিয়ে যায়। এর পর কোথায় তাকে রাখা হয়েছিল, তা জানেন না তিনি। ২৫ দিন আটকের পর কারা, কীভাবে তাকে রামপুরায় ফেলে রেখে গেছে, তাও অজানা তার। বলতে পারেন শুধু তার ওপর নির্মম নির্যাতনের কথা। তাকে অপহরণ ও ফিরিয়ে দেওয়ার কয়েক মাস আগে তার মা জেমি পারভীনকে অপহরণ করা হয়েছিল মিরপুর-১০ নম্বর এলাকা থেকে। অপহরণের পরদিন ভোরে মিরপুর বিআরটিএ অফিসের পাশে পাওয়া গিয়েছিল তাকে। কারা মা-ছেলেকে পৃথকভাবে অপহরণ করেছিল- এ প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও। কোনো উত্তর মিলছে না।

জেমির পরিবারের লোকজনের দাবি- সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় জেমির চাচাত ভাইদের সঙ্গে জমি নিয়ে প্রায় চার বছর বিরোধ চলছে। এর জেরেই মা-ছেলেকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে উল্লাপাড়ায় জেমিকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জেমি পাঁচ মাস কারাভোগও করেছেন। মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা দুটি মামলার বাদী যথাক্রমে জেমির চাচাত ভাই সোবহান ও জিল্লুর রহমান। তেজগাঁও থানার মামলায় গত ২৬ আগস্ট জেমিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

গত ২০ মার্চ রাতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুভ অপহরণের ঘটনায় তার বাবা মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে ২৫ মার্চ ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন। এতে অভিযুক্ত করা হয় পাঁচজনকে। তারা হলেন- আব্দুস সোবহান, আব্দুল মান্নান রতন, মানিক, উচ্ছ্বাস ও বাবুল। আসামিরা শুভর মায়ের আপন চাচাত ভাই। তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাজারঘাটি গ্রামে। মোহাম্মদ আলীর গ্রামের বাড়িও সিরাজগঞ্জ। তিনি সপরিবারে ধানমন্ডির পুরাতন ২৭ নম্বরে কনকর্ড টাওয়ারের ৫/বি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার এসআই সুব্রত বৈদ্য বলেন, জমিজমা নিয়ে বাদী ও আসামিদের মধ্যে দীর্ঘ দিনের বিরোধ রয়েছে। কারা শুভকে অপহরণ করেছিল, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

গতকাল শুভ সমকালকে বলেন, 'আমি বাসা থেকে নেমে রাস্তায় উঠি। এ সময় একটি নোয়াহ মাইক্রোবাস আমার পাশে থামিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে একজন জিজ্ঞাসা করে- মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে কোন দিক দিয়ে যাবে। এটা বলার পরই আমার কী হয়েছে, জানি না। দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে দেখি, একটা অন্ধকার ঘর। এর পর ওরা আমার হাত-পা বেঁধে কোমরের বেল্ট দিয়ে মারধর শুরু করে। তারা আমাকে অনেকবার মেরেছে। একদিন ব্লেড দিয়ে কেটে মরিচ আর লবণ ছিটিয়ে দেয়। জানতে চায়- ডকুমেন্ট আর ছবিগুলো কই? তোর মাকে ছবি দিতে বল। ডকুমেন্ট বলতে জমির দলিল চায়। সঙ্গে ৫০ লাখ টাকা। এগুলো না দিলে আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলা এবং আমার বোনকে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয় তারা। মনে হয়েছে, এসবই হয়েছে কয়েক দিনে। ঘরের মধ্যে দিন-রাত বুঝতাম না।'

শুভ জানান, তাকে পানতা ভাতের সঙ্গে কাঁচামরিচ খেতে দেওয়া হতো। যেদিন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, সেদিন তারা তাকে গোসল করতে বলে। গোসলে গিয়ে টের পান, তার মাথার চুলও কেটে দেওয়া হয়েছে। তার শরীরে অসংখ্য কাটা দাগ। কিন্তু মারলে যে ব্যথা লাগে, সে ধরনের ব্যথা ছিল না শরীরে। গোসল করে আসার পর আবার তার হাত-পা বাঁধা হয়। এ সময় একজনকে বলতে শোনেন, সোবহান তাকে ছেড়ে দিতে বলেছে। কারণ পুলিশ খুঁজছে। শুভ আরও জানান, সেখানে ৩-৪ জন ছিল। তাদের কেউ রাজশাহী এবং কেউ সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল। দু'জন তাকে কোপায়। তাকে জুসের মতো কিছু খাওয়ানো হয়। এর পর তার আর কিছুই মনে নেই। ওই দিনই (১৫ এপ্রিল) তাকে রামপুরা থেকে পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।