ঈদের ছুটি ১০ দিন করার দাবিতে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় সোমবার ভাঙচুর, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। তাদের নানাভাবে বোঝানো ও সমঝোতা বৈঠকের পরও একটি পক্ষ সাধারণ শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৩৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ২০ জন শ্রমিক ও ১৪ জন পুলিশ সদস্য। শহীদ আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) আহত শ্রমিকরা চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢামেকে ভর্তি ১২ শ্রমিকের মধ্যে একজন ছাড়া অন্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঈদের ছুটি বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন কারখানার মালিকরা। অধিকাংশ কারখানায় ৫ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ছুটি রয়েছে। যদিও করোনা সংক্রমণ রোধে তিনদিনের ছুটি ও কর্মস্থলে অবস্থান করার নির্দেশনা ছিল সরকারের।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান সমকালকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণেই সরকার এবার সব শিল্পকারখানার ছুটি তিনদিন করার ঘোষণা দেয়, যাতে ছুটি নিয়ে কেউ নিজ এলাকা থেকে দূরে কোথাও যেতে না পারে। সারাবছরের ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রমিকদের ছুটি তিনদিনের বেশি দিতে আমাদের আপত্তি থাকবে কেন? তবে শ্রমিকসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে এবারের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। পাশের দেশ ভারতের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ। বড় ছুটি নিয়ে শ্রমিকরা গ্রামে ছুটলে নিজের পরিবার ও আশপাশের লোকজনকে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।

ফারুক হাসান আরও বলেন, যেহেতু অল্প কিছু কারখানায় ছুটি বাড়ানোর দাবি উঠেছে, তাই আমরা বলেছি কারখানা কর্তৃপক্ষ নিজেরা সারাবছরের ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে তিনদিনের সরকারি ছুটি এক থেকে তিনদিন বাড়াতে পারেন। তবে বর্ধিত ছুটি পেয়ে যাতে তারা দূরে কোথাও না যান, এ ব্যাপারে সচেতনতা আরও বাড়ানো দরকার। বাস, লঞ্চ ও ট্রেনও বন্ধ রয়েছে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম সমকালকে বলেন, সরকারের তিনদিনের ছুটি ঘোষণাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। তবে কিছু কারখানায় বহিরাগত ও সুযোগসন্ধানীরা অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমন্বয় করে পাঁচ থেকে সাতদিন ছুটি বাড়ালেও করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা যাতে ছোটাছুটি করতে না পারেন, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। সুস্থভাবে বেঁচে থাকলে ঈদ করা যাবে।

গাজীপুরের পুলিশ কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবির সমকালকে বলেন, সরকারের ঘোষিত নির্দেশনা ও গৃহীত পরিকল্পনার আলোকে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে আমরা সচেষ্ট। সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে টঙ্গীতে উদ্ভূত পরিস্থিতির যৌক্তিক সমাধান করা হয়েছে।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের ডিসি মোহাম্মদ ইলতুৎমিশ সমকালকে জানান, সরকার এবার তিনদিন ছুটি ঘোষণা করলেও হা-মীম গ্রুপসহ অনেক কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকদের পাঁচ থেকে সাতদিন ছুটি মঞ্জুর করে। টঙ্গীতে হা-মীম গ্রুপের কারখানায় সাত দিনের ছুটি থাকবে- এটা শ্রমিকদের রোববারই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শ্রমিকরা এটা সানন্দে মেনেও নেন। তবে সোমবার সকালে কারখানায় গিয়ে কাজ বন্ধ করে যার যার আসনে বসে থাকেন শ্রমিকরা। কর্তৃপক্ষ এর কারণ জানতে চাইলে তারা ঈদের ছুটি ১০ দিন করার দাবি তোলেন।

ইলতুৎমিশ আরও জানান, কর্মবিরতির পর সকাল ১১টার দিকে কারখানার ভেতরে হা-মীম গ্রুপ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের সমঝোতা বৈঠক শুরু হয়। ওই সময় মালিকপক্ষ জানায়, বুধবার থেকে সাতদিন কারখানায় ছুটি থাকবে। বৈঠক চলাকালেই হঠাৎ কারখানার বাইরে একটি পক্ষ ১০ দিনের ছুটির দাবি জানিয়ে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন। তারা কারখানার গ্লাস, আসবাব ও বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত পুলিশকে লক্ষ্য করেও আক্রমণ চালান। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে ওই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ।

মন্তব্য করুন