রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটা বন্ধ এবং উদ্যান রক্ষার দাবি জানিয়েছে দেশের নাগরিক সমাজ। উদ্যানের মধ্যে কংক্রিট এবং অন্যন্য স্থাপনা ৫ শতাংশের বেশি থাকা যাবে না বলে যে বিধিমালা আছে সেটাও লংঘিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন বিশিষ্টজনরা।

বুধবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাছ কাটা বন্ধ এবং উদ্যান রক্ষার দাবিতে ভূমি-বন-বনবাসী রক্ষা জাতীয় কমিটি আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনায় এই দাবি জাননো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় এবং নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আলোচনায় সংযুক্ত ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি ও গাছ কাটার বিরুদ্ধে রিটকারী আইনজীবি এডভোকেট মনজিল মোরশেদ, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারন সম্পাদক সালেহ আহমদ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী, জনউদ্যোগের সদস্য সচিব তারিক মিঠুল, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং প্রমুখ।

সূচনা বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, আমরা যেসময় এই গাছ কাটার মহোৎসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি সেসময় পুরো পৃথিবী জুড়ে অক্সিজেনের বদ্ধ অভাব এবং অক্সিজেনের জন্য লড়াই করছি। সুন্দরবন ধ্বংস, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ওসমানী উদ্যান, মধুপুরের শালবন ধ্বংস ও পাহাড়ে বন ধ্বংস করে হোটেল নির্মাণ- এসব একই সূত্রে গাঁথা বলেও মনে করেন তিনি।

পুঁজিবাদের মহাসমনপ্রসারণ, তার পেছনের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের চক্রান্তের কারণে গাছ কেটে, বন কেটে, উদ্যানকে বানিজ্যিক জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, সরকারে যে থাকুক তাকে অন্ধভাবে দেশ চালাতে দেয়া যাবে না। লোভের কারণে ইতিহাস মুছে যাবে তা হতে দেয়া যাবে না। এই জায়গা (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ধ্বংস হলে বঙ্গন্ধু, জাহানারা ইমাম সহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সোচ্চার নাগরিক আন্দোলন জারি রেখে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।

নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, একটি দেশের মিনিমাম যে পরিমাণ গাছ থাকা দরকার, সেটা আমাদের দেশে নাই। সরকারিভাবে ১৬ শতাংশের বেশি বলা হচ্ছে। কিন্তু তা আসলে নেই। মধুপুর গড়ের গাছ কেটে একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস লাগিয়ে এই শালবনকে ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার।

গাছ কাটার বিরুদ্ধে রিটকারী আইনজীবি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ ‘বিভাগীয় শহর, জেলা শহরের পৌর এলাকা ও দেশের সকল স্থানের উন্মুক্ত এলাকা, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন’ এর উল্লেখ করে  বলেন, উদ্যানের কোনো ক্যারেক্টার পরিবর্তন করা যাবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেহেতু ডিকলার্ড উদ্যান। তাই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়েছে যে কোনো রূপ বৃক্ষরাজির নিধনকেও শ্রেণি পরিবর্তন হিসাবে গণ্য করা হবে। গাছ যদি কাটা হয় তাহলে উদ্যান ধ্বংস হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও আইনে বলা আছে। আর যদি ধ্বংস করা হয় তাহলে পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে।

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, আর কিছু না হোক এই মুহূর্তে এই বিষয়টিকে (গাছকাটা) আমরা একটা স্থগিতাদেশের মধ্যে নিয়ে গিয়েছি। এই বিষয়গুলোর পেছনে আসা সিদ্ধান্তগুলোর উৎস জানতে হবে।

এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, যখন একটা বৈশ্বিক মহামারির সংকট চলছে এবং সে মহামারী আসছে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। সেখান থেকে আমরা মনে হয় কিছুই শিখলাম না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে ধারাবাহিক কার্যক্রম চলছে তারই একটা অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আকসাদুল আলম বলেন, প্রকৃতিকে যে রক্ষা করতে হবে, তার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের যে রাজনীতি সেটাকে আমরা কতটুকু সামনে আনি। একটা জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তাছাড়া পরিবেশকে সামনে এনে রেসকোর্স বাদ দিয়ে উদ্যান হওয়া এবং শিশু পার্ক স্থাপন এসবের পেছনে যে রাজনীতি এগুলো সামনে নিয়ে আসা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এই কাজগুলোর পেছনে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতা এবং কর্পোরেটদের স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশ এখন বিশাল আমলা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নেন জনউদ্যোগের সদস্য সচিব তারিক মিঠুল, আমিনুর রসুল, জনউদ্যোগের লুনা নুর, মিহির বিশ্বাস, আলমগীর কবীর, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং প্রমুখ।





বিষয় : সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

মন্তব্য করুন