লকডাউনে ৪৯ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল সোমবার থেকে চলছে দূরপাল্লার বাস, যাত্রীবাহী ট্রেন ও লঞ্চ। তবে প্রথম দিনে বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রী কম ছিল। সীমিত সংখ্যক ট্রেন চলাচলের সময়টুকু বাদে বাকি সময় খাঁ খাঁ ছিল দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুর। অধিকাংশ যাত্রী মাস্ক পরে টার্মিনালে প্রবেশ করতে বাধ্য হলেও অপেক্ষার সময়টুকুতে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা ছিল অনেকেরই। প্রবেশ পথে যাত্রীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাস-ট্রেন-লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি বিঘ্নিত হলে চড়া মূল্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, উচ্চ সংক্রমণের শঙ্কার মধ্যে দূরপাল্লার পরিবহনগুলো চলাচলের অনুমতি দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে আন্তঃজেলা পরিবহন চালুর সিদ্ধান্তটিও সঠিক ছিল না। কারণ আন্তঃজেলা পরিবহন চালুর পর ঈদে ভেঙে ভেঙে মানুষ গ্রামে এবং নগরীতে যাতায়াত করেছেন। এতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এখন দূরপাল্লার পরিবহন চালুর পর ভিড় বাড়তে পারে। এখন লক্ষ্য থাকবে যথাযথভাবে মাস্ক ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। অন্যথায় পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।
আসন সংখ্যার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের শর্তে গণপরিবহনের চলাচলে বিধিনিষেধ তুলে নেয় সরকার। রোববার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এরপর রাতেই বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে গেছে।
গতকাল দুপুরে গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দূরপাল্লার বাস রাতে চলায় দিনে যাত্রী কম। অধিকাংশ কাউন্টার ফাঁকা। চালক-শ্রমিকরা বলেছেন, ঈদ গেছে ক'দিন। সবাই গ্রাম থেকে ফিরেছে। আবার লকডাউন চলছে। এ কারণে যাত্রী কম।
হানিফ পরিবহনের উপমহাব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, অর্ধেক আসনেও যাত্রী পূর্ণ হচ্ছে না। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে ভাড়া সাধারণ সময়ের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি নেওয়া হচ্ছে। আগে যে দূরত্বে ৫০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, এখন তা ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া কাউকে বাসে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। বাসে ওঠার আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে।
লোকাল হিসেবে চলা বাসে এসব বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। তবে তারা ভাড়া নিচ্ছে কম। ঢাকা থেকে গাইবান্ধাগামী 'জাকের পরিবহন'-এর চালক জানালেন, তার বাসে ৪১টি আসন রয়েছে। ২০ জন যাত্রী নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তিনি ২৫-২৬ জন যা পাচ্ছেন নিচ্ছেন। কারণ, লোকাল বাসে ৬০০ টাকায় গাইবান্ধা যাওয়ার যাত্রী নেই। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের যাত্রীরাই তার বাসে চড়েন। করোনার আগেও তিনি সরকার নির্ধারিত ৪০০ টাকার চেয়ে কম ভাড়া নিতেন। এখনও তাই নিচ্ছেন।
একই চিত্র রাজধানীর মহাখালী টার্মিনালে। এ টার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গের কয়েক জেলা ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলার বাস চলে। ৪০ আসনের বাসে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের ভাড়া যাত্রীপ্রতি ২১৫ টাকা। লকডাউনে অর্ধেক আসন খালি রেখে চলায় বেড়ে হয়েছে ৩৫০ টাকা। এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, অর্ধেক আসন খালি রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে।
তবে লোকাল হিসেবে চলা বাসগুলো যাত্রীপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়ায় চলছে। 'সৌখিন', 'আলম এশিয়া'সহ বিভিন্ন পরিবহনের চালক-শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের বাসে ৩৫০ টাকায় চলার যাত্রী নেই। আবার অর্ধেক সিট খালি রেখে কম ভাড়ায় চলা সম্ভব নয়। তাই ৩০-৩২ জন যা পাচ্ছেন নিচ্ছেন।
যাত্রী কম ছিল কমলাপুরেও। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়া সাতটি আন্তঃনগর ট্রেনের একটিতেও আসনের অর্ধেক যাত্রীও হয়নি। করোনা সংক্রমণ রোধে ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরুর দিনেই দূরপাল্লার বাসের সঙ্গে ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।
রেলের বহরে ১০২ জোড়া আন্তঃনগর এবং ২৬০ জোড়া মেইল, কমিউটারসহ ৩৬২ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন রয়েছে। গতকাল চলেছে মাত্র ২৮ জোড়া আন্তঃনগর এবং ৯ জোড়া মেইল ও কমিউটার ট্রেন। রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী সমকালকে বলেছেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে সব ট্রেন চালু হবে। কমলাপুর স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ে যাত্রীতে গমগম করা প্ল্যাটফর্মগুলো খাঁ খাঁ।
গতকাল সকালে কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শনে যান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, আপাতত আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট শুধু অনলাইনে বিক্রি হবে। লোকাল ও কমিউটার ট্রেনের টিকিট স্টেশনে বিক্রি হবে।
লঞ্চেও ৬০ ভাগ বেশি ভাড়ায় আসনের অর্ধেক যাত্রীর পরিবহনের শর্ত রয়েছে। সদরঘাট থেকে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গন্তব্যে লঞ্চ ছেড়ে গেছে। লঞ্চ চলেছে অন্যান্য ঘাটেও। লঞ্চ বন্ধ থাকায় গত ৪৯ দিনে ফেরিতে গাদাগাদি করে নদী পার হতে হয়েছে। ঈদের আগে গাদাগাদিতে ছয়জনের প্রাণ গেছে ফেরিতে।
বাস-ট্রেনে যাত্রী কম হলেও লঞ্চে গাদাগাদি ভিড় ছিল। ধারণ ক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে ঢাকা নদীবন্দর থেকে ছেড়েছে বেশিরভাগ লঞ্চ। বিভিন্ন এলাকা থেকে সদরঘাটে আসা লঞ্চগুলোতেও আরও বেশি যাত্রী ছিল। জানা গেছে, ঈদের পর ঢাকামুখী যাত্রীই বেশি। তাই যেসব লঞ্চ ঢাকায় আসছে, সেগুলোতে যাত্রী বেশি। অর্ধেক আসন খালি রেখে ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হলেও তার চেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আঘাত হানার আশঙ্কায় যাত্রীবাহী নৌযানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য সতর্ক করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। গতকাল সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, চাঁদপুর থেকে ছেড়ে আসা বেশিরভাগ লঞ্চ ছিল যাত্রীতে পূর্ণ। লঞ্চের ডেকে বসা বেশিরভাগ যাত্রীর মাস্ক ছিল না। কিছু কিছু লঞ্চের সামনে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকলেও যাত্রীদের তা ব্যবহারে আগ্রহ দেখা যায়নি।
ঢাকা নদীবন্দর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল থেকে সদরঘাটে লঞ্চ এসেছে ১৩টি। ছেড়ে গেছে ৩৭টি।

বিষয় : স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের দূরপাল্লায় গণপরিবহন চালু

মন্তব্য করুন