ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমবায় সমিতির প্রায় ৪৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংস্থাটিরই কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। সমিতির সাধারণ সদস্যদের ভাষ্য, বাস্তবে লুট হয়েছে আরও বেশি। যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তারাই এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত।

সমিতির সদস্যদের অনেকেই জানান, ওই টাকা তাদের পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এক পয়সাও পাননি। বিষয়টি ধরা পড়ার পর ওয়াসা কর্তৃপক্ষ শুরুতে সোচ্চার হলেও পরে 'অজ্ঞাত কারণে' নমনীয় হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষই এখন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে পানির বিল ইস্যু ও আদায়ের দায়িত্ব পায় ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমবায় সমিতি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত তারা প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিল আদায় করে। এর ১০ শতাংশ পায় সমিতি। প্রতিবছর এ খাতে সমিতির লভ্যাংশ থাকে এক থেকে দেড়শ কোটি টাকা। এই টাকা জনতা ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় একটি চলতি হিসাব নম্বরে জমা হয়। কিন্তু ওই টাকার কোনো হিসাব সমিতির নেতারা কোনো সময় সদস্যদের দেননি। সমিতির নির্বাচন ও নিরীক্ষাও হয়নি। এ নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান সমিতির অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য চেয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন।

২০১৯ সালের ৩০ জুন তাকসিম এ খান সমিতির চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ বরাবর চিঠি দিয়ে জানান, 'প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, ৪৪৫ কোটি টাকা নিয়মিত বিরতিতে উক্ত (সমিতির) হিসাব থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ও নগদে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানান্তর করা খাতগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের চলতি হিসাব নম্বর ০৮৪১১১০০০১৬৮৪১, লাইফলাইন শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা স্থানান্তর হয়েছে। এ ছাড়া বনলতা কর্মদক্ষতা উন্নয়ন শ্রমজীবী সমবায় সমিতির এনবিএলের হিসাবেও টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। সমিতির ব্যাংক হিসাব থেকে এভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে। ওয়াসার কর্মচারীদের স্বার্থে এবং উক্ত লেনদেন দেশের প্রচলিত মানি লন্ডারিং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য এই টাকা কোথায়, কেন এবং কী পরিমাণ স্থানান্তর করা হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ অবস্থায় ১০ দিনের মধ্যে টাকা স্থানান্তরের বিস্তারিত বিবরণী প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য নিম্ন স্বাক্ষরকারীর বরাবরে প্রেরণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।'

কিন্তু সমিতি হিসাব দাখিল করেনি। সমিতির সদস্যরা জানান, পানির বিল আদায় করে যে কমিশন সমিতি পায়, সেই টাকা সমিতির সদস্যদের মধ্যে সমহারে বণ্টন করার কথা।

এ প্রসঙ্গে সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান সমকালকে বলেন, যখন এ ঘটনা ঘটে, তখন কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন হাফিজ উদ্দিন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিয়া মো. মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আতাউর রহমান। এর মধ্যে মিজানুর রহমান অবসরে। অন্য দু'জনের মৃত্যু হয়েছে।

মিজানুর রহমান দাবি করেন, বিল আদায়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর কম্পিউটার কিনতে হয়েছে। একটি অফিস নিতে হয়েছে। এ ছাড়া আরও বিভিন্নভাবে টাকা খরচ হয়েছে। আর অনেক টাকা ওয়াসা নিয়েছে। তারা দেয়নি। সেই টাকা সমিতি পাবে। পরে হাফিজ মারা যাওয়ার পর ওই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে।

মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, তারা একটা জবাব তখন দিয়েছিলেন বলে শুনেছি। সেখানে তারা বলেছিল, যেসব প্রতিষ্ঠানে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে, পানির বিলের কাগজপত্র ছাপানোর জন্য ওই টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর এটা নিয়ে কোনো কিছু জানা যায়নি।

নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা: ২০০৩ সাল থেকে কোনো নির্বাচন করেনি সমবায় সমিতি কর্তৃপক্ষ। নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোনো নতুন কর্মচারীকে ভোটার হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত করেননি। এ অবস্থায় সাধারণ সদস্যরা অভিযোগ করলে ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ছয় সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি করে দেয় সমবায় অধিদপ্তর। কিন্তু আগের কমিটি দায়িত্ব ছাড়েনি। পরে ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে দেয় অধিদপ্তর। কিন্তু ওয়াসা ভবনে ভোট অনুষ্ঠান না করার জন্য সমবায়ের মহাপরিচালককে চিঠি দেন ওয়াসার এমডি। পরে শেরেবাংলা নগরে সমবায় ভবনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্থান ঠিক করা হয়।

এর আগে ২৪ ডিসেম্বর ওয়াসার সচিব শারমিন হক কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে একটি অফিস আদেশ জারি করে ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি প্রার্থীদের একেক করে ডেকে নেন ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম, পরিচালক একেএম শহিদ উদ্দিন ও আবুল কাশেম। তারা প্রত্যেককে নির্বাচন থেকে সরে আসতে বলেন। কিন্তু কেউ সাড়া না দিলে তাদের আবার ডেকে বলে দেওয়া হয়, যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের বরখাস্ত করা হবে।

এ অবস্থায় দুটি প্যানেল নিজেদের প্রত্যাহার করে। আরও কয়েকটি প্যানেল প্রত্যাহারের জন্য গেলেও সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদেরটা গৃহীত হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে ৪৬ জনের নাম ব্যালটে রয়ে যায়। এর মধ্য থেকে কমিটির ১২ জন নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের সময় ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা জহুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সমিতিতে নানা অনিয়ম ছিল, যে কারণে তারা নির্বাচন করতে চাচ্ছিল না। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নির্বাচন না করার ব্যাপারে এতই সোচ্চার ছিল যে শেষ পর্যন্ত সমবায় অধিদপ্তরের নিচে অব্যবহূত একটি ক্যান্টিনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। পরে সমিতির বাকি অনিয়ম তদন্ত করার জন্য তেজগাঁও ও রমনার দু'জন সমবায় কর্মকর্তাকে দিয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছেন। তারা এখন অনিয়ম উদ্ধারের তদন্ত করবে। কিন্তু ওয়াসায় সব প্রভাবশালী লোক তো। এ জন্য সেখানে কাজ করা খুব কঠিন।

ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, এমডি চাইছিলেন, এটা যেহেতু একেবারে নিজেদের ব্যাপার। এ জন্য নির্বাচন না করে বরং সবাই মিলে বসে একটি সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি করতে। এটাই তখন প্রার্থীদের বলা হয়েছিল। চাকরিচ্যুতির হুমকি কাউকে দেওয়া হয়নি।

চাকরিচ্যুতির চেষ্টা: নির্বাচনে জয়ী হওয়া ১২ জনের ১১ জনকে নির্বাচনের পর ধাপে ধাপে কারণ দর্শাও (শোকজ) নোটিশ দেয় ঢাকা ওয়াসা। প্রথমে বলা হয়, নির্বাচনের কারণে ঢাকা ওয়াসায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া তারা নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেককে সাত দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কারও জবাবই ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং কেন চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে না, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত শুনানি করা হয়। এ ছাড়া যারা বিজয়ী হননি, কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান একাধিক প্রার্থী।

নির্বাচিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন সরকার বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই হুমকি-ধমকি চলছিল। নির্বাচনের পরও মামলা-হুমকি চলছে। এমনকি সমিতির অফিসও তারা খুলতে দিচ্ছে না।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করায় তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটা নির্বাচনের কারণে নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ আছে।

বিপদে সোনা মিয়া: সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থীরা ঢাকা ওয়াসার এমডির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গেলে এমডি তাদের প্রত্যেককেই পদত্যাগ করার কথা বলেন। কিন্তু এমডির আহ্বানে কেউ সাড়া দেননি। গত ২৫ মার্চ বিজয়ী সদস্য সোনা মিয়া পদত্যাগপত্র দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, '...কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনা মান্য করে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য পদ হতে অদ্য পদত্যাগ করলাম।'

কিন্তু 'কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনা মান্য করে' শব্দটি থাকায় নাখোশ হয় কর্তৃপক্ষ। সোনা মিয়া সমকালকে বলেন, কর্তৃপক্ষ বলেছিল ভোটের দিন কেন্দ্রে না যেতে। আমি যাইওনি। কিন্তু ভোটাররা আমাকে ভালোবাসে বলে ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করেছিল। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মান্য করলেও এখন আমাকে শোকজ করছে।