পুড়ে ধ্বংসস্তূপ হওয়া এলাকায় ঘুরে ঘুরে নিজের ঘরটি খুঁজছিলেন রফিকুল ইসলাম। শেষ পর্যন্ত পেয়েছেন আসবাব পোড়া ছাই। তা-ই দেখিয়ে বললেন, এখানেই ঘর ছিল। খাট, টিভি, ফ্রিজ সব ছিল। ছিল সাজানো ছোট্ট সংসার। এখন পুরো পরিবারেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই।
রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি ঘরে থাকতেন রফিকুল ও তার পরিবার। গতকাল সোমবার ভোরের আগুনে চোখের সামনে সব ছাই হয়ে গেছে।
পেশায় রিকশাচালক রফিকুল জানান, রাতে সবকিছু নিয়েই ঘুমিয়েছিলেন। আগুন লাগার খবরে ঘুম ভেঙে গেলে দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে বের হন। মুহূর্তেই চোখের সামনে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিজের ঘরটিও পুড়তে দেখেন।
রফিকুলের মতো এই কান্না বস্তিজুড়েই। সাততলা ওই বস্তিতে আগুনে তার মতো কয়েকশ পরিবার সব হারিয়ে নিঃস্ব্ব হয়েছেন। তবে আগুনে হতাহতের খবর মেলেনি। গতকাল ভোর ৪টার দিকে বস্তিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ফায়ার সার্ভিস বলছে, আগুনে শতাধিক ঘর পুড়েছে। তবে বস্তির লোকজন বলছেন, একেকটি ঘরে ভিন্ন ভিন্ন একাধিক পরিবার থাকতেন। সে হিসেবে আগুনে পাঁচ শতাধিক পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। ছয় মাস আগে এই সাততলা বস্তিতে আগুন লেগে আড়াই শতাধিক ঘর পুড়েছিল।
গতকালের আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ফায়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিক জানাতে পারেনি। তবে ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে সংস্থাটি চার সদস্যের কমিটি করেছে। ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, বস্তিটিতে অনেক অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই দুটির থেকে যেকোনো একটির কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। টিন ও বাঁশের মতো দাহ্যবস্তু থাকায় আগুন নেভাতে সময় লেগেছে।
বস্তির একজন বাসিন্দা সাফিয়া আক্তার বলছিলেন, রাত সাড়ে ৩টার দিকে দক্ষিণ পাশে একটি ঘরে রান্নার কাজ চলছিল। চুলা থেকে হঠাৎ করে গ্যাস লিকেজ হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেখানে থাকা লোকজন আগুন আগুন বলে চিৎকার শুরু করলে তিনিসহ অনেকেই ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসেন। শুরুর দিকে তাদের অনেকেই পানি দিয়ে তা নেভানোর চেষ্টাও করেছিলেন। না পেরে শুধু প্রাণ নিয়ে তারা নিরাপদে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সাফিয়ার মতো আরও কয়েক বাসিন্দা বলেন, বস্তির এক জায়গাতে আগুন লাগলে তা দ্রুতই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্লাস্টিকের পাইপে থাকা গ্যাস আর দুর্বল বৈদ্যুতিক তারের জন্য আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সাততলা বস্তির পোড়া অংশটি ঘুরে দেখা যায়, ছাই ঘেঁটে অনেক বাসিন্দাই শেষ সম্বলটুকু খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। কেউ কেউ সব হারিয়ে পোড়া ভিটায় বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আর চোখের পানি মুছছিলেন।
আগুনে সব হারানো সালমা খাতুন বলেন, ঘরে থাকা খাবার, কাপড় সব পুড়েছে। কানের স্বর্ণের দুল আর হাতের বালা দুটি নিয়েও বের হতে পারেননি। তবে এসবের চেয়ে তার কষ্টটা দুটি পোষা পাখি নিয়ে।
অনেকটা হাহাকার করে বলছিলেন, খাঁচার ভেতর পাখি দুটিকে নিজের সন্তানের মতো করেই লালন করছিলেন। নিজে না খেয়ে এদের খাওয়াতেন। আগুন লাগার পর ধোঁয়া দেখে নিজেরা বের হলেও সেই খাঁচাটি আর নিতে মনে ছিল না। সকালে দেখেন খাঁচার ভেতর পাখি দুটি পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।
বস্তির বাসিন্দা পোশাককর্মী নাসরিন আক্তার বলছিলেন, তারা কিছু নিয়েই বের হতে পারেননি। ঘরে ১৫ হাজার টাকা রেখেছিলেন, তাও পুড়েছে। কোথায় থাকবেন, খাবেন কী কিছুই বুঝতে পারছেন না।
আগুন নেভানোর পর বাবা শহীদুল ইসলামকে নিয়ে পোড়া ধ্বংসস্তূপে ছাই ঘেঁটে নিজের বই খুঁজছিল স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী স্মৃতি আক্তার। কিন্তু তা আর পাওয়া যায়নি, পোড়া আসবাবের নিচে মিলল পোড়া বইয়ের অংশবিশেষ। তা ধরেই ডুকরে কাঁদছিল মেয়েটি।
মেয়েটির বাবা শহীদুল বলেন, আগুন লাগার পর স্মৃতিসহ তিন সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বের হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ওর বইগুলো বের করতে পারেননি। বুঝতে পারছেন না বই কেনার টাকা পাবেন কোথায়?
মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশাল জায়গাজুড়েই নানা নামে বস্তি গড়ে উঠেছে। এসব বস্তির খুপরি ঘরগুলোতে নিম্ন আয়ের রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও পোশাক কর্মীদের বসবাস। বিভিন্ন সময়েই আগুন লেগে তারা নিঃস্ব হন। স্থানীয় লোকজন বলছিলেন, গত বছরের ২৩ নভেম্বর মধ্যরাতে মহাখালীর ওই বস্তি এলাকায় ভয়াবহ আগুন লেগেছিল। এর আগে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও সাততলা বস্তি এলাকায় আগুন লাগে।
'বস্তির কেউ অভুক্ত থাকবে না': আগুন লাগার পর সাততলা বস্তি এলাকায় যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
মেয়র বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কেউ অভুক্ত থাকবে না। তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারের জন্য নগদ পাঁচ হাজার করে টাকা, তিন বেলা খাবার, ঢেউটিন এবং শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আতিকুল ইসলাম আরও বলেন, বস্তিবাসী আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই তাদের উচ্ছেদ নয় পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন