'রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প' নামে ২০০১ সালে ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। পরে দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ২০৩ কোটি টাকায়। ২০১১ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষে বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণের সময় জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিবর্তে নগরীর জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে ওই প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে।

পরিকল্পনা কমিশনের 'বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ' (আইএমইডি) এ প্রকল্প সম্পর্কে মূল্যায়ন রিপোর্টে তীব্র সমালোচনা করে জানায়, প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করার কথা ছিল, সে রকম অনেক কাজের কোনো নমুনাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপরও প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজের জন্য আরও ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প-২ বাস্তবায়ন করা হয়। ২০১৩ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। কিন্তু তারপরও রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর হয়নি। বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাত হলে এখনও রাজপথ যেন সাগর-নদীতে পরিণত হয়।

১০ বছরে যত ব্যয় :কেবল এ দুটি প্রকল্পই নয়, গত এক দশকে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে আরও চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ঢাকা ওয়াসা। এ ছাড়া পাইপড্রেন ও বপ-কালভার্ট পরিস্কারের নামেও প্রতিবছর খরচ করা হয়েছে গড়ে ২০ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত ১০ বছরের ব্যবধানে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় করেছে অন্তত দুই হাজার ২৩ কোটি টাকা।

পাশাপাশি ঢাকার সিটি করপোরেশনও প্রতিবছর এ খাতে ব্যয় করেছে গড়ে ১৫০ কোটি টাকা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেন উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে। দুই সিটি করপোরেশনের গত তিনটি অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ সময়ে তারা দুই হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা এ খাতে খরচ করেছে। ফলে ড্রেনেজ খাতে দুই সিটি করপোরেশন গত তিনটি অর্থবছরেই খরচ করেছে ২৯৩ কোটি টাকা। অবিভক্ত সিটি করপোরেশন থাকার সময় প্রতি অর্থবছর এ খাতে বাজেট ছিল গড়ে ৪০০ কোটি টাকা। কাজেই আগের সাতটি অর্থবছরেও এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। সে হিসাবে সিটি করপোরেশন এ খাতে ১০ বছরে মোট ব্যয় করেছে ৫৭৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১০ বছরে ব্যয় করেছে দুই হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। তারপরও সম্প্রতি বর্ষা ঋতু আসার আগেই কয়েক দফা ভারি বর্ষণে রাজধানীতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। অনেক স্থানেই নদী-সাগরের চেহারা দেখতে পেয়েছেন নগরবাসী।

এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের পেছনে ঢাকা ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশন যে বিপুল অর্থ খরচ করেছে, তাতে কোনো সুফল মেলেনি। সেটার দায় তাদেরই নিতে হবে। এ জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

তবে ঢাকা ওয়াসার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম বলেন, যখন একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, সেটাতে কী কী কাজ হলো, সেসব কাগজপত্র সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়। তারা সেগুলো দেখেন। এখন কেউ যদি বলে, টাকা লুটপাট হয়েছে, কাজ হয়নি, তাহলে বলার কিছু নেই।

এক দশকে ছয় প্রকল্প: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক দশকে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ছয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এগুলোর একটি হলো, ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শেরেবাংলা নগর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প। পরে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের পেছনে ব্যয় ধরা হয় আরও ২৪৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় রোকেয়া সরণির আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১০ নম্বর পর্যন্ত সড়ক ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের কথা বলা হয়।

এরপর নেওয়া হয় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ খাল আধুনিকায়ন প্রকল্প। এ খালগুলোর মধ্যে ছিল হাজারীবাগ খাল, মুগদা-বাসাবোর মান্ডা খাল, মিরপুরের বাইশটেকি খাল ও সাংবাদিক কলোনি খাল। ওয়াসা বলেছিল, এসব খাল খনন করে প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে পাড় বাঁধাই করে পায়ে চলার পথ (ওয়াকওয়ে) তৈরি করলে ভবিষ্যতে খালগুলোকে দখলদারদের হাত থেকে বাঁচানো যাবে। এতে সেসব এলাকার বৃষ্টির পানিও খাল দিয়ে পাশের নদীতে চলে যেতে পারবে; কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।

জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও নেওয়া হয় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে 'ঢাকা সিটি ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট'। এ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর যেসব এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, সেসব এলাকায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হয়।

সব প্রকল্পই নেওয়া হয় সরকারের অর্থায়নে। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কার্যত কোনো ফল আসেনি।

এগুলোর বাইরে 'রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের' দুই পর্যায়ের আওতায় কথা ছিল ঢাকা মহানগরীর ২৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন, বপ কালভার্ট নির্মাণ, খাল উন্নয়ন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূর করা হবে। তখন ওয়াসার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, প্রকল্পের আওতায় মহাখালী ডিওএইচএস, ধলপুর, সূত্রাপুর, ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিট, কোর্ট-কাচারি সংলগ্ন জনসন রোড, মিরপুর-১ ও ১০ নম্বর গোলচত্বর হয়ে ১১ নম্বর সেকশন বরাবর কালশী খাল পর্যন্ত, মিরপুর রোকেয়া সরণি, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে কচুক্ষেত বাউনিয়া খাল পর্যন্ত এলাকায় পাইপড্রেন নির্মাণ এবং ব্রিক স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সেসব এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না; কিন্তু এসব স্থানে এখনও ব্যাপক জলাবদ্ধতা হচ্ছে। বিশেষত মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, রোকেয়া সরণির কাজীপাড়া ও কালশী এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে।

তবু কেন জলাবদ্ধতা: গত এক দশকে ছয়টি প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন রাজধানীতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী একেএম শরীফ উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল কাজ ঢাকা ওয়াসার। তবে বৃষ্টির পানি যাতে রাস্তা থেকে গড়িয়ে ড্রেনে যেতে পারে ও সেখান থেকে ওয়াসার পাইপ ড্রেনে যেতে পারে, সে জন্য সিটি করপোরেশন ড্রেন ও কিছু এলাকায় পাইপড্রেনও নির্মাণ করেছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে বৃষ্টির পানি খালে বা জলাশয়ে চলে যাওয়ার কথা। সেখান থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে সেই পানি যাওয়ার কথা তুরাগ, বালু বা বুড়িগঙ্গা নদীতে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারছে না।

তিনি বলেন, এমনও দেখা গেছে, চটবাড়ি বা কল্যাণপুর পাম্পিং স্টেশনে যে পানি যাবে- সেই ব্যবস্থাও নেই। অনেক জায়গায় খালই নেই। থাকলেও গভীরতা চলে এসেছে তিন ফুটে। এ জন্য বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। অথচ পাম্পিং স্টেশনের জলাধারে কোনো পানি নেই। আসলে গত এক দশকে ঢাকা ওয়াসা বেশি নজর দিয়েছে পানির উৎপাদন বাড়াতে। খালের দিকে তাদের নজর ছিল কম।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতি-অনিয়ম তো হয়েই থাকে। তা ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ছিল এতদিন ঢাকা ওয়াসার হাতে। প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমেই জলাবদ্ধতা নিয়ে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন পরস্পরকে দোষারোপ করে; সে জন্যই পুরো দায়িত্ব এখন সিটি করপোরেশনের হাতে দেওয়া হয়েছে। তবে এবার তারা বেশি সময় হাতে পায়নি; কিন্তু আগামী বছর তাদের জবাবদিহি করতে হবে।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন উন্মুক্ত ড্রেন নির্মাণ করেছে। তাদের অর্থ ব্যয় হয়েছে মূলত এর পেছনেই। কিন্তু ওই ড্রেন পরিস্কার ও ব্যবস্থাপনার জন্যও প্রতি বছর তাদের একটা অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। কারণ পরিস্কারের ১৫-২০ দিন পর ড্রেন আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো ময়লায় ভরে যায়। ফলে ক্যাসপিডগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্যই সিটি করপোরেশনের বিপুল অর্থ খরচ হয়ে গেছে। এখন নতুন প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পনামাফিক নিলে ফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া স্থানিক জলাবদ্ধতাগুলো সিটি করপোরেশন চাইলে দ্রুতই সমাধান করতে পারে।

দুই মেয়রের অভিমত: এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অতীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে কী হয়েছে, কী না হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে এবার আমরা এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ওয়াসার কাছ থেকে খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর থেকেই কাজ শুরু করেছি। যার সুফল সাম্প্রতিক কয়েকদিনের অতিবর্ষণের সময় পাওয়া গেছে। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের পরও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকেনি। খালগুলো উদ্ধারের জন্য কাউন্সিলরদের পুরস্কার ঘোষণা করেছি। কাউন্সিলরদের এক সপ্তাহের মধ্যে খালের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তারা যদি উদ্যোগ নিয়ে খাল দখলমুক্ত করতে না পারে, তাহলে করণীয় কী, সে বিষয়েও তাদের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে খালের দখলদাররা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আমরা খাল উদ্ধার করে ছাড়ব।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, করপোরেশন কিছু কাজ করার কারণেই এ বছর কিছুটা হলেও মানুষ সুফল পেয়েছে। কিছুটা সুফল যদি পেয়ে থাকে, তাহলে সেটা কাজ করার জন্যই পেয়েছে। স্লুইসগেটগুলোর দায়িত্ব কিন্তু আমরা এখনও বুঝে পাইনি। দায়িত্ব পাওয়ার আগেই যদি আমরা একটু অগ্রবর্তী থাকি, তাহলে খারাপ কী! ওয়াসার কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার আগেই শ্যামপুর-কালুনগর খালে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। আশা করছি, আগামী দুই বছরের মধ্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতা সহনীয় মাত্রায় চলে আসবে।

বিষয় : রাজধানীর দুর্ভোগ বর্ষা

মন্তব্য করুন