ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মতো করোনাভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহে ঢাকায় রোগী শনাক্তের হার বেড়েছে দ্বিগুণ। এক সপ্তাহ আগে রাজধানীসহ ঢাকা জেলায় রোগী শনাক্তের হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশের কাছাকাছি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় তা বেড়ে সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় এক সপ্তাহ আগে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৫ শতাংশের কিছু বেশি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
দেশের ৪৫টি জেলাকে করোনার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে ২১টি সীমান্তবর্তী জেলা। অন্য চব্বিশ জেলার মধ্যে কয়েকটি সীমান্ত জেলার লাগোয়া আর কয়েকটি দূরবর্তী। অর্থাৎ সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে ধাপে ধাপে সংক্রমণ দেশের অন্যান্য জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর মার্চে করোনা সংক্রমণের শুরুতে ঢাকায় রোগী বেশি ছিল। ধাপে ধাপে তা সারাদেশে ছড়িয়েছিল। এখন সীমান্তবর্তী জেলা থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী উচ্চ সংক্রমিত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে লকডাউন না দেওয়ার কারণে তা ক্রমেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন কার্যকর করা হলে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রশাসন চরম অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। এখন ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
গত ৮ জুন রাজধানীতে সাত হাজার ৭৮৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৬৯ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই দিন ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলায় ৯ হাজার ৫১টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪৫৪ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ৯ জুন রাজধানীতে ৯ হাজার ৯৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫৩১ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই দিন ঢাকা বিভাগে ১০ হাজার ৩৫৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ৭২৭ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ১০ জুন রাজধানীতে ছয় হাজার ৯৭৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৮৮ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। ওই দিন ঢাকা বিভাগে আট হাজার ৬৮৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫১৩ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ১১ জুন রাজধানীতে ছয় হাজার ৯৭৯টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৮৫ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর ঢাকা বিভাগে আট হাজার ৫৩৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪৮০ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। ১২ জুন রাজধানীতে তিন হাজার ৬৪২টি নমুনা পরীক্ষা করে ২১২ জন রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে চার হাজার ৭৯৩টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪১৪ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
১৩ জুন রাজধানীতে আট হাজার ২৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫২৮ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। একই দিন ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ৫১০টি নমুনা পরীক্ষা করে ৬৬৭ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। গতকাল সোমবার ১৪ জুন রাজধানীতে ৯ হাজার ৩৩৪টি নমুনা পরীক্ষা করে ৬৯২ রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের হার ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগে ১১ হাজার ১০০টি নমুনা পরীক্ষা করে এক হাজার রোগী শনাক্ত হন। শনাক্তের ৯ শতাংশের কিছু বেশি।
সীমান্তের বাইরে ২৪ জেলা :ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর আশঙ্কা ছিল বাংলাদেশেও তা ছড়িয়ে পড়বে। ওই শঙ্কা থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা আসে। কারণ, করোনার ভারতীয় ধরন 'ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট' যাতে দেশে ছড়িয়ে না পড়ে; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসা ও ভ্রমণে ভারতে গিয়ে আটকে পড়া কয়েক হাজার বাংলাদেশি এ সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে ফেরা ওই সব যাত্রীকে সঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন করা হয়নি। এতে করে ভাইরাসটি প্রথমে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ধাপে ধাপে অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
দেশের মোট ৪৫ জেলায় করোনার সংক্রমণ এখন ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিটি জেলায় শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি। শনাক্তের হারের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য বিভাগ এই জেলাগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। এর মধ্যে 'এ' ক্যাটাগরিভুক্ত ১০টি জেলায় গত এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। 'বি' ক্যাটাগরিভুক্ত ১৪ জেলায় শনাক্তের হার ২১ থেকে ২৯ শতাংশ এবং 'সি' ক্যাটাগরিভুক্ত ২১ জেলায় শনাক্তের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে।
গত এক সপ্তাহে 'এ' ক্যাটাগরিভুক্ত সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নড়াইল, রাজশাহী, নাটোর, যশোর, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা ও লালমনিরহাট- এই ৯ জেলায় শনাক্তের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। 'বি' ক্যাটাগরিভুক্ত জামালপুর, নঁওগা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রাম- এই সাত জেলায় শনাক্তের হার ২১ থেকে ২৯ শতাংশ এবং 'সি' ক্যাটাগরিভুক্ত মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী ও হবিগঞ্জ- এই পাঁচটি জেলায় শনাক্তের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
গত এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নিয়ে সীমান্তের বাইরে একমাত্র পিরোজপুর জেলা 'এ' ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। 'বি' ক্যাটাগরিভুক্ত বাগেরহাট, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও গোপালগঞ্জ- এই সাত জেলায় শনাক্তের হার ২১ থেকে ২৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। 'সি' ক্যাটাগরিভুক্ত চাঁদপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম. ঝালকাঠি, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, শেরপুর, নরসিংদী, মাদারীপুর, কক্সবাজার, গাইবান্ধা, গাজীপুর ও লক্ষ্মীপুর- এই ১৬ জেলায় শনাক্তের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
সীমান্তের বাইরে খুলনা জেলায় শনাক্তের হার ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর পরই ফরিদপুরে শনাক্তের হার ২১ দশমিক ৩৬ শতাংশ, গোপালগঞ্জে ১৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, টাঙ্গাইলে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, নোয়াখালীতে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ, পিরোজপুরে ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ, এবং কক্সবাজারে ১০ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে।
সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পর সীমান্তবর্তী সাত জেলায় আরও এক সপ্তাহের লকডাউনের সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি; কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। এখন ধাপে ধাপে সংক্রমণ অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর করোনার সংক্রমণের শুরু হয়েছিল ঢাকায়। এরপর সেটি ধাপে ধাপে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এবার সংক্রমণের শুরু হয়েছে সীমান্তবর্তী জেলা থেকে। এটি ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে হয়তো রোগী বাড়বে। কারণ নামমাত্র বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা হয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে। এতে করে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়বে। সুতরাং এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, ভারতীয় ধরন সংক্রমিত এলাকাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করছে সরকার। এখানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনের বিষয় নয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। চলাচলের ওপর একটি বিধিনিষেধ জারি করার পর যেন আর কোনো কাজ নেই সংশ্নিষ্টদের। এতে করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, কিছুদিন ধরে ঢাকায় সংক্রমণ কম ছিল। এখন আবার ঢাকায় রোগী বাড়তে শুরু করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাইরে অন্য কোনো পন্থা নেই।

বিষয় : করোনা ঢাকায় দ্বিগুণ রোগী

মন্তব্য করুন