মা-বাবা ও বোনের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন মেহজাবিন ইসলাম মুন। তাই ছয় মাস আগে তিনজনকেই হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর একটি-দুটি করে ঘুমের ওষুধ সংগ্রহ শুরু করেন। শুক্রবার রাতে সেই ট্যাবলেট গুঁড়া করে চা, কফি ও পানিতে মিশিয়ে দেন। সেগুলো খেয়ে সবাই অচেতন হয়ে পড়লে শ্বাসরোধে তিনজনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার দুই মাস আগেও একবার তরমুজের জুসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিবারের সদস্যদের হত্যার চেষ্টা চালান মুন।

রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকার লাল মিয়া সরকার রোডের বাসায় তিন খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার মুন জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে শনিবার রাতে তার বিরুদ্ধে কদমতলী থানায় হত্যা মামলা করেন তার চাচা সাখাওয়াত হোসেন। এতে তার স্বামী শফিকুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় গতকাল রোববার মুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। চিকিৎসাধীন শফিকুলকেও এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ সমকালকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মুন একাই তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তবে তার স্বজনরা বলছেন, অর্থ ও সম্পত্তির জন্য এ হত্যাকাণ্ড। এতে শফিকুলও জড়িত। এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য মুনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার স্বামীকেও আজকালের মধ্যে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

শনিবার সকালে নিজেদের বাসা থেকে জাতীয় জরুরি সেবা '৯৯৯' নম্বরে ফোন করে তিনজনকে হত্যার কথা জানান মুন। পরে পুলিশ গিয়ে সেখান থেকে তার বাবা মাসুদ রানা, মা মৌসুমী ইসলাম ও ছোট বোন জান্নাতুল ইসলাম মোহিনীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে। অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় মুনের স্বামী শফিকুল ও তাদের মেয়ে মারজান তাবাসসুম তৃপ্তিকে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, পরিবারটির সদস্যদের মধ্যে জটিলতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বিয়ের আগে আমিনুল ইসলাম নামের এক যুবক মুনকে প্রাইভেট পড়াতেন। এ সময় ছাত্রীর সঙ্গে তার প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ওই গৃহশিক্ষক ছাত্রীর মা মৌসুমীর সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। দু'জনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ভিডিও করে রেখেছিলেন আমিনুল। সেটি হয়ে ওঠে তার হাতিয়ার। ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তিনি মা-মেয়েকে জিম্মি করে অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি তিনি মুনের ছোট বোন মোহিনী ও তার এক আত্মীয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করেন। এই বহুমুখী জটিলতাপূর্ণ সম্পর্কের একপর্যায়ে মুনকে শফিকুলের সঙ্গে বিয়ে দেন মৌসুমী। এতে ক্ষিপ্ত হন আমিনুল। তিনি মুনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও তার স্বামীকে দেখান। এতে মুনের সংসারে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। অন্যদিকে মৌসুমীও তখন আমিনুলের ওপর বিরক্ত। শেষে শফিকুল, মৌসুমী ও তার এক বোন মিলে আমিনুলকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় মুন আসামি হলেও পরে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ অপর তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পড়ালেখায় ভালো ছিলেন মুন। এসএসসি পরীক্ষায় তার জিপিএ ৫ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার মা আগেই দুই মেয়েকে অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হতে বাধ্য করেছেন। এমনকি পরীক্ষা চলাকালেও তাকে ছাড় দেওয়া হয়নি। এ কারণে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৮ পান মুন। কৈশোরে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত করায় তিনি মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। আবার তার বাবা মাসুদ রানা প্রবাসে আরেকটি বিয়ে করেছেন, দুই মেয়ের ব্যাপারে তিনি কোনো মনোযোগ দেননি। মায়ের নির্যাতন থেকে মেয়েদের বাঁচাতে কোনো ভূমিকা না রাখায় তার প্রতিও ক্ষোভ জমে ছিল মুনের। আর শ্যালিকা মোহিনীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন শফিকুল। এতে সংসার ভাঙার উপক্রম হওয়ায় ছোট বোনকেও দুনিয়া থেকে সরানোর পরিকল্পনা করেন মুন। সে অনুযায়ী দুই মাস আগে প্রথমবার তিনি মা-বাবা-বোনকে হত্যার চেষ্টা চালান। সেদিন মা ও বোন ঘুমের ওষুধ মেশানো জুস খেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তবে ডায়াবেটিস রোগী হওয়ায় খেতে রাজি হননি বাবা মাসুদ। ফলে পরিকল্পনা সফল হয়নি।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, তরমুজ খাওয়ার পর মা-মেয়ে এত ঘুমাচ্ছেন কেন? তরমুজ সম্ভবত পচা ছিল, তাই বিষক্রিয়া হয়েছে- এমন ব্যাখ্যা দিয়ে প্রসঙ্গ কাটিয়ে দেন মুন। সে ঘটনা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এত অল্প মাত্রার ওষুধে হবে না। হত্যা করতে হলে মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে। এ কারণে তিনি শুক্রবার দুই মিলিগ্রাম মাত্রার ৪০টি ট্যাবলেটের গুঁড়া পানীয়তে মেশান। অথচ এই ওষুধ একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ চার মিলিগ্রাম পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারেন।

এদিকে, মুন হত্যার দায় স্বীকার করলেও ঘটনাটি একা তার পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন স্বজনরা। তার খালা মোছা. ইয়াসমিন সমকালকে বলেন, আমিনুল হত্যা মামলা নিষ্পত্তির জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ২০ লাখ টাকা চেয়ে আসছিলেন শফিকুল। সেইসঙ্গে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছিলেন। টাকা না দেওয়ায় তিনি বিভিন্নভাবে স্ত্রী ও শাশুড়িকে নির্যাতন করতেন।

জানা গেছে, চার বছর আগে একবার তিনি শাশুড়িকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালান। সেবার প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর দগ্ধ হন মৌসুমী। এ ঘটনা বাইরে প্রকাশ না করতেও চাপ দেওয়া হয়েছিল। আর শ্যালিকা মোহিনীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের একটি ভিডিও শফিকুলের কাছে ছিল। সেটি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে কয়েক বছর ধরে মেয়েটির ওপর যৌন নির্যাতন চালান তিনি। যখনই মোহিনীর বিয়ের প্রস্তাব আসত, তিনি মেয়েটিকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে বিয়ের উদ্যোগ ভণ্ডুল করে দিতেন। দাবিমতো টাকা না পেয়ে শফিকুল এই হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে স্ত্রী মুনকেও এতে যুক্ত হতে বাধ্য করেন। মুন যে হত্যার দায় স্বীকার করছেন- এটি তার স্বামীরই পরিকল্পনার অংশ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে স্বজনরা আশা করেন।

কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর সমকালকে বলেন, শ্যালিকার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি পুলিশও কিছুটা ধারণা করেছে। আর সেই ভিডিওটির কথাও শোনা গেছে। তবে এখনও সেটি হাতে পাওয়া যায়নি।

'ক্রাইম প্যাট্রোল' ও মোবাইল গেমে আসক্ত ছিলেন মুন: পুলিশ জানায়, মা, বাবা ও বোনকে হত্যায় গ্রেপ্তার মুন ভারতীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'ক্রাইম প্যাট্রোল'-এর মনোযোগী দর্শক ছিলেন। অপরাধবিষয়ক অনুষ্ঠানটির প্রতিটি পর্ব তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। সেইসঙ্গে তিনি একটি মোবাইলে অনলাইন ফোন গেমেও আসক্ত ছিলেন। অর্থের বিনিময়ে সেটি খেলতে হতো। তাতে নায়ক নানা কৌশলে শত্রুদের মেরে ফেলে। এ ছাড়া অচেতন করে হত্যার কৌশল সম্পর্কে জানতে অনলাইনে প্রচুর অনুসন্ধান চালিয়েছেন মুন। তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের ধারণা, ক্রাইম প্যাট্রোল দেখা, মোবাইল গেম খেলা ও অনলাইন অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। এসব ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মামলায় যা বলা হয়েছে: তিন খুনের ঘটনায় মুন ও তার স্বামী শফিকুলকে আসামি করে কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। এতে বাদী উল্লেখ করেন, বিয়ের পর থেকেই আসামিরা মৌসুমীর কাছ থেকে অর্থ দাবি করত। টাকা না পেলে নানাভাবে জ্বালাতন করত। সেইসঙ্গে তারা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্যও চাপ দিয়ে আসছিল। এতে রাজি না হওয়ায় তিনজনকে হত্যা করা হয়।

এদিকে, হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল মুনকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিষয় : কদমতলীতে ৩ খুন কদমতলী স্বামীর বিরুদ্ধেও মামলা

মন্তব্য করুন