ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকাকে নারীর জন্য বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে এবং নারী কাউন্সিলরদের ভূমিকা বাড়াতে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এজন্য তাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মহিলা পরিষদকে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে সিটি করপোরেশনের তিনজন নারী প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটা 'ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। একইসঙ্গে নারী কাউন্সিলরদের কাজ করার ক্ষেত্রে যেসব বৈষম্য রয়েছে তা দূর করারও আহ্বান জানান।

সোমবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে 'শক্তিশালী ঢাকা সিটি করপোরেশন: নারী কাউন্সিলরদের ভূমিকা' বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনলাইনে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

আতিকুল ইসলাম বলেন, সনাতন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে এখন সমস্যা সমাধানে সকলকে কাজ করতে হবে। কাজে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে এবং পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করতে হবে।

মেয়র বলেন, ২০০৯ সালের ৬০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নারীরা সিটি করপোরেশনে আসেন। নির্বাচন করেন। অথচ গেজেট না থাকায় তাদের দায়িত্ব দেয়া সম্ভব হয় না। এ সময় তিনি নারীদের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথা তুলে ধরেন। 

তিনি আরও বলেন, এআরবি’র (অ্যাসেসমেন্ট রিভিউ বোর্ড) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নারীকে দেয়া হয়েছে। নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য অফিসচলাকালীন নারীদের জন্য ভাতা চালু করা হয়েছে। পেনশন প্রথা চালু হয়েছে। বীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। নারী কাউন্সিলরদের কাজে যে বৈষম্য করা হয় তা দূর করতে হবে। এখনো নারীরা কথা বলার সুযোগ পান না। তাদের জন্য সকলকে কাজ করতে হবে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহিলা পরিষদের সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত আন্দোলন সম্পাদক রেখা চৌধুরী। তিনি বলেন, জাতিসংঘের বসতি সংক্রান্ত উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর এই ঢাকা। বর্তমানে ঢাকা শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী, ভাসমান মানুষের বাস। সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা দানের পরিধিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল জনগোষ্ঠী নানা দুর্ভোগ নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব (নগর উন্নয়ন-২ অধিশাখা) সায়লা ফারজানা বলেন, সরকারকে নানা ধরনের টার্গেট বাস্তবায়নে কাজ করতে হয়। তার মধ্যে নারীর উন্নয়নের জন্য নানামুখী কাজ করতে হয়। নারী কাউন্সিলরদের ভূমিকা বাড়াতে হলে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ তাদের পেছনে রেখে এই টার্গেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়, সংবিধানে, আইনে সামাজিক উন্নয়নে নারীদের অবদান রাখার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে গ্যাপ রয়েছে, যেমন- ক্যাপাসিটি ও তথ্যগত গ্যাপ আছে। নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা দায়িত্বগুলোতে গ্যাপ চিহিৃত করে বাস্তবায়নে সকলকে কাজ করতে হবে। নারী কাউন্সিলরদের নিজ অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে, গুণগত পরিববর্তনে গুরুত্ব দিতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদেরও দূর করতে হবে। নিজের গ্যাপ চিহিৃত করে প্রয়োজনীয় জায়গায় যেতে হবে। ওয়ার্কিং গ্রুপ করে পুরো আইনটির সংশোধনের জন্য কাজ করতে হবে।

শক্তিশালী ঢাকা সিটি করপোরেশন: নারী কাউন্সিলরদের ভূমিকা বিষয়ক অনলাইনে মতবিনিময় সভা


সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শক্তিশালী ঢাকা সিটি কোন বাস্তবতায় হচ্ছে সেটি দেখতে হবে। আমাদের সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কাজ করা ও স্বাচ্ছন্দে বসবাসের সুযোগ সম্পন্ন ঢাকা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারী কাউন্সিলরদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, 'এখানে বিভিন্ন শ্রেণির নারীরা আছেন। ইনফরমাল সেক্টরে অনেক নারী কাজ করছেন। তাদের জন্য কাজ করতে হবে। যারা প্রশাসনে ক্ষমতায় আছেন তাদের জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল অ্যাপের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় ডিএনসিসির কাউন্সিলর সাথী আক্তার, জাকিয়া, শিখা, কাসেম মোল্লা ও হাসিনা বারী জানান, আমরা একটা শুভঙ্করের ফাঁকির মধ্যে পড়েছি। আইনি বাধার কারণে জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সময় তারা নারী কাউন্সিলরদের উদ্দেশ্যে বলা 'সংরক্ষিত' কথাটি বাদ দেওয়ার দাবি জানান। 

তারা আরও বলেন, নারী কাউন্সিররা নিজ যোগ্যতায় পুরুষদের চেয়ে বেশি ভোটে নির্বাচিত হন। তিনটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পান- তাহলে কেন তারা সমানভাবে কাজ করতে পারবেন না? অনেক সময় হয়রানি করা হয়। বরাদ্দের ক্ষেত্রে পুরুষদের জন্য ৮০% ও নারীদের জন্য ২০% দেয়া হয়। এই ব্যবধানের কথা গেজেটে কোথাও বলা নেই। এখানে সমানভাবে সেবা প্রদানের সুযোগ দিতে হবে। তবে নারী-পুরুষ উভয়ই উপকৃত হবে।

সংগঠনের অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক জনা গোস্বামীর সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।