রাজধানী ঢাকায় ভুয়া চিকিৎসক, লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাঝেমধ্যেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সিলগালা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরপরও বন্ধ হয়নি তাদের কার্যক্রম। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর গ্রিন রোডের 'হার্টবিট ফার্টিলিটি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার'। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চলছে প্রতিষ্ঠানটি।
দীর্ঘদিন যেসব দম্পতি নিঃসন্তান রয়েছেন, চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করছে হার্টবিট ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে দেওয়া হচ্ছে চটকদার বিজ্ঞাপন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। দেখা গেছে, যে প্রতিষ্ঠানের নামে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়া হয়, সেটির অস্তিত্বই নেই। এ ছাড়া অবৈধভাবে ভারতীয় এক চিকিৎসকের মাধ্যমে অনলাইনে রোগী দেখানো হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সাবেক রেজিস্ট্রার ডা. জাহিদুল হক বসুনিয়া সমকালকে বলেন, বিদেশি কোনো চিকিৎসক এদেশে চিকিৎসা কার্যক্রম চালালে অবশ্যই বিএমডিসির অনুমোদন নিতে হবে। কেউ যদি অনুমোদন না নিয়ে রোগী দেখেন, সেটা হবে অবৈধ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, হার্টবিট ফার্টিলিটি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শামীম আহম্মেদ। চিকিৎসা পেশায় কোনো অভিজ্ঞতা নেই তার। 'নোভা আইভিআই ঢাকা লিমিটেড' নামে অস্তিত্বহীন আরেকটি ডায়াগনস্টিকের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্সটি নেন ধানমন্ডির একটি ভবনের ঠিকানায়। কিন্তু সেখানে ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। আগেও ছিল না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ভবনের পঞ্চম তলায় 'গ্রীন ইনফার্টিলিটি সেন্টার' নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অংশীদার ছিলেন শামীম আহম্মেদ। এই ঠিকানা ব্যবহার করেই নোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রীন ইনফারটিলিটি সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়। এর পর গ্রিন রোডের গাজী টাওয়ারের চতুর্থ তলায় হার্টবিট ফার্টিলিটি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে অকারণে শারীরিক একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় দম্পতিদের। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য রয়েছে আলাদা ফি। একাধিক রোগী অভিযোগ করেছেন, কোনো ধরনের পরীক্ষা না করিয়ে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে তাদের। কারণ, সিমেন সংগ্রহ করা হচ্ছে হার্টবিট ফার্টিলিটি অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। আর পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়া হয় বন্ধ থাকা 'গ্রীন ইনফারটিলিটি সেন্টারের' প্যাডে।
গ্রীন ইনফার্টিলিটি সেন্টারের আরেক অংশীদার চিকিৎসক নাবিদ তওসিফ হোসাইন বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের আরেক অংশীদার ছিলেন শামীম আহম্মেদ। শামীম চিকিৎসকদের স্বাক্ষর নকল করে রোগীদের প্যাথলিজিক্যাল রিপোর্ট দিতেন। এটি জানার পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শামীম নতুন করে ডায়াগনস্টিক সেন্টার দিয়েছেন গাজী টাওয়ারে।
গ্রীন ইনফারটিলিটির প্যাডে এখনও রোগীদের প্যাথলিজিক্যাল রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক নাবিদ তওসিফ বলেন, 'আমিও কয়েকজন রোগীর মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। এটি একটি প্রতারণা। বিষয়টি আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি।'
হার্টবিট ডায়াগনিস্টক সেন্টারের মালিক শামীম আহম্মেদ সমকালকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়েছে কয়েক মাস হলো। লাইসেন্সের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্টরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে গেছেন। তবে এরই মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরে কে বা কারা অভিযোগ দিয়েছে। সে বিষয়ে অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ভারতের চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত থেকে একজন চিকিৎসক অনলাইনে রোগী দেখেন। অনলাইনে রোগী দেখতে বিএমডিসির অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া 'নোভা আইভিআই ঢাকা লিমিটেড' নামের প্রতিষ্ঠানটি অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বিষয় : ভুয়া চিকিৎসক লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল

মন্তব্য করুন