রাজধানী ঢাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রভূমি কোনটি? স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। নব্বইয়ের দশকে তারুণ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকার নাটকপাড়া খ্যাত বেইলি রোড। সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। মঞ্চ নাটকের সেই রমরমা দিনও নেই আর। সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমি চত্বরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে তারুণ্যের উপস্থিতি থাকলেও এলাকাটি তাদের দৈনন্দিন আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন অনেকটাই টিভি ও অনলাইননির্ভর হয়ে পড়েছে।
অথচ দুই দশক আগে ১৯৯৭ সালে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ঢাকায় 'সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়' স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ লক্ষ্যে ওই বছরের ৮ জুলাই শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক বলয় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত নকশায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি, পাবলিক লাইব্রেরি, জাতীয় জাদুঘর, শিশু একাডেমিসহ আশপাশের এলাকার ২৬টি স্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই স্থাপনাগুলোকে তারুণ্যের সংস্কৃতিচর্চার উপযোগী করে সাজিয়ে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু দুই যুগেও সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। বিভিন্ন সময়ে সংস্কৃতিকর্মীরা এ নিয়ে দাবি তুললেও তাতে টনক নড়েনি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু সমকালকে বলেন, 'চারদিকে যে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানো দরকার। এটি শুধু ঢাকায় নয়, দেশের সব জেলা ও উপজেলায় হতে হবে। এই পরিবেশ তৈরির জন্য সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক বলয়- যেটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন এলাকা মিলিয়ে করার প্রস্তাব ছিল, সেটি করতে হবে। যাতে আবারও ঢাকা তারুণ্যের পদভারে প্রকম্পিত হয়। একসময় ঢাকা ছিল সংস্কৃতিচর্চার স্পন্দন বা কেন্দ্রবিন্দু। সেটি বিভিন্ন কারণে এখন ক্ষয়ে যাচ্ছে।'
সাংস্কৃতিক বলয় নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দীন বলেন, 'শুধু সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করলেই হবে না, সেখানে দেশি-বিদেশি শিল্পী, কলাকুশলীদের নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় জেলা ও উপজেলা থেকে যেসব শিল্পী-কলাকুশলী ঢাকায় আসেন, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এ জন্য জেলা-উপজেলা-শহরগুলোতেও 'কালচারাল ভিলেজ' তৈরি করা দরকার।' এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করেন তিনি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পরিকল্পিত 'সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়' প্রকল্পটি ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুরোপুরি হিমঘরে চলে যায়। তবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১০ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে তাগিদ দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠকও হয়। পরে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি নকশা তৈরি করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা। সেখানে এ বলয়ের প্রস্তাবিত সীমানায় রাজধানীর ২৬টি স্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয়।
সীমানার স্থাপনাগুলোর মধ্যে উত্তর পাশে রয়েছে রমনা পার্ক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকা ক্লাব, জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ ভবন (বেতার) ও শিশুপার্ক। উত্তর-পূর্ব পাশে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, অফিসার্স ক্লাব ও বেইলি রোডের নাটক সরণি। দক্ষিণ পাশে রয়েছে জাতীয় তিন নেতার মাজার, ঐতিহাসিক ঢাকা গেট, শিশু একাডেমি, কার্জন হল, এশিয়াটিক সোসাইটি, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত তৎকালীন কলাভবন ও ঐতিহাসিক আমতলা। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব। দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। পূর্ব পাশে রয়েছে শিল্পকলা একাডেমি ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন। পশ্চিম পাশে রয়েছে জাতীয় জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি, চারুকলা অনুষদ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ ও লাইব্রেরি, টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা ও বাংলা একাডেমি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু এরপর এ নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
জানতে চাইলে সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী নাট্যব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর সমকালকে বলেন, 'অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু অগ্রগতি হয়নি। এর সঙ্গে তিনটি মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকায় তাদের প্রত্যেকেরই কিছু প্রস্তাব ছিল, যেগুলোর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। তখন দায়িত্বে থাকায় কিছুটা দায় আমার ওপরেও বর্তায়।' তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী এ প্রকল্পের বিষয়ে আগ্রহী। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছপালা ও পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয়- সে বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনার আলোকে সমন্বিত পরিকল্পনা করলে সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে।'
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, 'পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি খোলা জায়গা। এর পরিবেশ কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ হোক, এটা কেউ চাইছে না। এ জন্যই প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত আছে। এর অর্থ এই নয় যে, সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলা হবে না।'
তিনি জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বলয়ের মতো করে রাজধানীর হাতিরঝিলেও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি হবে 'বঙ্গবন্ধু অপেরা হাউস'। প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে এখানে সাংস্কৃতিক সব ধরনের ব্যবস্থাই থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য এ-সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। এ বছরেই এর কাজ শুরু হবে কিনা, এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলে এ বছরই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হতে পারে।'
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় প্রকল্পের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা- এমন প্রশ্নে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'এখনই সেটি বলা যাচ্ছে না। আর সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়ে যা যা থাকার কথা, তার সবই বঙ্গবন্ধু অপেরা হাউসে থাকবে। সেভাবেই পরিকল্পনা করে এ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।'
পরে বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নজরে নেওয়া হলে তিনি বলেন, সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা কী, তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। তবে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা দিয়ে নতুন করে বিন্যস্ত ও সংস্কার করছি।'
সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন্দনতত্ত্ববিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, 'হাতিরঝিলে যে বঙ্গবন্ধু অপেরা হাউস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি হোক। কিন্তু এটি যেন সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়ের বিকল্প না হয়। সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় অবশ্যই হতে হবে। দুটি প্রকল্পই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পা ও নির্দেশনায় হচ্ছে। এখানে এমন অজুহাত যেন না হয়- এটি হয়েছে, ওটি হবে না।'
তিনি বলেন, দেশে সংস্কৃতিবিরোধী একটি প্রবণতা আছে। সে জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতির বিকাশ জাতির চিত্তের জাগরণ ঘটায়। মানুষের মনের ভেতরকে উন্মুক্ত করে। এখন যে সহিংসতা দেখছি, তা প্রতিরোধের জন্যও এটি খুবই দরকার।

বিষয় : 'সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়'

মন্তব্য করুন