রাজধানী ঢাকাকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা যে ব্যর্থ হয়েছে, গাবতলী সেতুর দুই প্রান্তের হাজারো মানুষের ভিড় তা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে। সেতুতে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও অনেক মানুষ হেঁটে এপাড় থেকে ওপাড় যাচ্ছে মানুষ। এরপর সেতু পেরিয়ে প্রাইভেটকার, পিকআপে চড়ে যে যেভাবে পারছে ছুটছে গন্তব্যে। দূরদূরান্তের জেলা থেকে একই পন্থায় ঢাকায় আসছেন হাজারো মানুষ।

বৃহস্পতিবার গাবতলী সেতু এলাকার দুই পাড়ে এসব দৃশ্যের দেখা মেলে। বেলা দেড়টার দিকে সেতুর পেরিয়ে দেখা গেলো, যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাইভেটকার। ডেকে ডেকে হেমায়েতপুরের যাত্রী তুলছেন চালক আজিজুল ইসলাম। যাত্রী প্রতি ১০০ টাকা নিচ্ছেন মাত্র আট কিলোমিটার পথের জন্য। গাড়ির পেছনের সিটে চারজন এবং সামনে একজন করে যাত্রী তোলা হচ্ছে।

কয়েক গজ সামনেই যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল নীল রঙের একটি পিকআপ। জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় নবীনগরের যাত্রী তুলছে। মোটরসাইকেলগুলো জনপ্রতি ২৫০ টাকা ভাড়ায় নবীনগর, আশুলিয়ার যাত্রী খুঁজছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এ পথে বাস ভাড়া ৪০ টাকা। দূরদূরান্তের জেলা থেকে বাসে চন্দ্রা, গোড়াই, পাটুরিয়ায় পর্যন্ত এসে- একই প্রক্রিয়ায় ভেঙে ভেঙে ঢাকায় আসছে মানুষ। আগের দু'দিন কড়াকড়ি থাকলেও এখন পুলিশের বাঁধা ছাড়াই আসছেন তারা। 

যাত্রীরা বলছেন, ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় জন-চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। শুধু শুধু তাদের ভুগতে হচ্ছে যানবাহন সঙ্কট ও উচ্চ ভাড়ার কারণে।

করোনার সংক্রমণ রোধে গত মঙ্গলবার ভোর থেকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে যান চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ চলছে। যা লকডাউন নামে পরিচিতি পেয়েছে। এ কারণে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ আছে ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল। এবারের লকডাউনের উদ্দেশ্য ছিল, রাজধানীকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে করোনার ভারতীয় ধরণের সংক্রমণ ঠেকানো। লক্ষ্য পূরণে লকডাউনের প্রথম দিনের পথে পথে বেশ কড়াকড়ি ও পুলিশ পাহারা ছিল। যত দিন যাচ্ছে লকডাউন ততই ঢিলেঢালা হচ্ছে অতীতের মতোই।

গাবতলী সেতু পেরিয়ে আমিনবাজার গিয়ে দেখা যায়, সেখান থেকে বাসসহ প্রায় সব ধরনেই যানবাহনই চলছে। এসব বাস চন্দ্রা, নবীনগরের দিকে যাচ্ছে। চন্দ্রা থেকে কিছুটা হেঁটে বা রিকশায় টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের গোড়াই যাচ্ছেন যাত্রীরা। যেখান থেকে বাসে দেশের যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যাচ্ছে। আর নবীনগর থেকে যে যেভাবে পারছেন মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট গিয়ে ফেরি পার হয়ে দক্ষিণবঙ্গে যাচ্ছেন যাত্রীরা।

লকডাউনে ঢাকায় মানুষের আসা-যাওয়া থেমে নেই। তবে পথে পথে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া -সমকাল 

আমিনবাজার বাসের হেলপার মো. সুমন বলেন, লকডাউনের কারণে কারো যাওয়া-আসা থেমে নেই। যার যাওয়ার সে ঠিকই যাচ্ছে। যার দরকার সে ঢাকায় আসছেই। যাত্রী স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কিছু কম। ঢাকার সঙ্গে বাস বন্ধ থাকায় তাদের ও যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো পরিবর্তন নেই।

আমিনবাজার থেকে ঢাকায় ফিরতি পথে সেতুতে তীব্র যানজট চলছে গত তিন দিন ধরে। রাজধানীর গাড়িগুলোকে গাবতলী থেকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণে এ যানজট। বৃহস্পতিবার এ যানজট ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছিল। সেতুতে ওঠার আগে কথা হয় কিশোর মো. সোহাগের সঙ্গে। ১৪ বছর বয়সী সোহাগ এসেছে বগুড়া থেকে। তিনশ' টাকায় বাস গোড়াই আসে। সেখান থেকে ব্যাগ-বোচকা মাথায় নিয়ে আসে চন্দ্রা। তারপর ৫০ টাকায় পিকআপে আমিনবাজার এসেছে। সেখান থেকে আবার ব্যাগ নিয়ে হাঁটা ধরেছে। 

সোহাগ বলে, শিশু হাসপাতালের সামনে দোকানে কাজ করে সে। এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি গিয়ে আটকা পড়েছিল। লকডাউনে দোকান খোলা, আসতে তো হবেই। চন্দ্রা থেকে বাস বন্ধ থাকায় ভোগান্তি হলো তার। বাড়তি টাকাও লাগল। এ টাকা তাকে কে দেবে?

আগের দিনগুলোতে সেতুর আমিনবাজার পাড়ে পুলিশ পাহারা থাকলেও বৃহস্পতিবার দুপুরে কাউকে দেখা যায়নি। মোটরসাইকেলে ঠিক ৫৫ মিনিটের যানজট ঠেলে সেতু পার হওয়ার পর পুলিশের দেখা মিলল। পুলিশের উপ-পরিদর্শক নিয়ামুল কবির জানালেন, লকডাউন কার্যকরে ঢাকা থেকে যাত্রীবাহী কোনো যানবাহনকে সেতু পার হতে দেওয়া হচ্ছে না।

তবে তার আগে 'গার্মেন্টস কর্মীদের পরিবহন' ব্যানার লাগানো কয়েকটি বাস চলতে দেখা যায় সেতুতে। সেগুলোতে আমিনবাজার থেকে হাঁকডাক দিয়ে যাত্রীও তুলতে দেখা যায়।

বিষয় : লকডাউন গাবতলী

মন্তব্য করুন