রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট শেষ সময়ে জমে ওঠে। বাসাবাড়িতে পশু রাখার জায়গা কম থাকায় অনেকেই ঈদের দু-একদিন আগে হাটে যান। এবার করোনার ঊর্ধ্বগতির কারণে ভীতিকর পরিস্থিতি চারদিকে। দীর্ঘ লকডাউনে অনেকের আয়-রোজগারেও টান পড়েছে। এমন সংকটের মাঝেও গত শনিবার থেকে পশুর হাটগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে বিক্রি কম। গতকাল রোববার সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, হাটগুলো গরু-ছাগলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে। ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর হাট এলাকা। ইজারাদার ও বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতারা হাটে আসতে শুরু করেছেন। বেচাবিক্রিও বেড়েছে। আজ সোমবার ও আগামীকাল মঙ্গলবার পুরোদমে বেচাকেনা চলবে। ক্রেতাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পশু থাকলেও বিক্রেতারা দাম হাঁকাচ্ছেন বেশি। ফলে ক্রেতারা ছোট ও মাঝারি গরু কেনার বেলায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

এদিকে, হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি একেবারেই মানা হচ্ছে না। শিশু ও বয়স্কদের হাটে আসার নিয়ম নেই। কিন্তু বেশির ভাগ ক্রেতা আসছেন সপরিবারে। গরু ব্যবসায়ীদের হাটে প্রবেশ করার কথা জীবাণুনাশক টানেল দিয়ে। অথচ হাটের প্রবেশপথে দেখা যায়নি টানেল। অবশ্য মাইকের বিরতিহীন ঘোষণায় স্বাস্থ্য সচেতনতার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে কাউকে কর্ণপাত করতে দেখা যায়নি।

গতকাল রাজধানীর গাবতলী, মোহাম্মদপুরের বছিলার তিনটি হাট, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই গরু বেচাকেনা হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ গরু দেখতে ভিড় করেছেন। বেশির ভাগ গরু ব্যবসায়ীর মুখে মাস্ক নেই। অনেক ক্রেতার মধ্যেও মাস্ক ব্যবহারে অনীহা দেখা গেছে।

গাবতলী হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের চাপে স্বাস্থ্যবিধি উধাও হয়েছে। বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক নেই। ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। মিরপুরের টোলারবাগ আবাসিক এলাকা থেকে একসঙ্গে গরু কিনতে গাবতলী এসেছেন মাহফুজুর রহমান, লতিফুর রহমান, আব্দুল হক, আকরাম হোসেন, জামাল উদ্দিন, আজিজুর রহমান ও খলিল উল্যাহ। তাদের কয়েকজনের মুখে মাস্ক নেই। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই মাহফুজুর রহমান বলেন, গরুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানা কঠিন। সব জায়গায় মানুষের ওপর মানুষ।

গাবতলীর হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য রাকিব জানান, এবার গাবতলী হাটে ৭০ হাজারের মতো গরু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে হাট থেকে সব রকমের প্রচারণা করা হচ্ছে। ৯০০ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আছে ১৫টি ওয়াচ টাওয়ার।

হাটের প্রবেশদ্বারে র‌্যাব ক্যাম্প আছে। জাল টাকা নিয়ে যেন প্রতারণার শিকার না হন, এ জন্য ১০টি হাসিল ঘরে ২০টি জাল টাকা শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো হয়েছে।

হাজারীবাগ পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক দিনের তুলনায় হাটে গরুর আমদানি বেড়েছে। 'সুলতান', 'রোমিও', 'বস', 'টাইগার'সহ নানা নামের একেকটি গরুর দাম অবস্থাভেদে ৫০ হাজার থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। এই এলাকার লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন আশপাশের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সবই ভরে রয়েছে হরেক রকম গরুতে।

রংপুর থেকে গাবতলীর পশুর হাটে এসেছে 'সুলতান'। দেড় হাজার কেজি বা সাড়ে ৩৭ মণ ওজনের সুলতানই দেশের সবচেয়ে বড় ও সুন্দর গরু বলে দাবি করছেন তার মালিক মামুন। তবে গরুটি এখনও বিক্রি হয়নি। তিনি দাম হাঁকিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। তুলনামূলকভাবে মাংসের ওজন বিবেচনায় বড় গরুর দাম ছোট গরুর চেয়ে কম হলেও মোহাম্মদপুরের বছিলার স্বপ্নধারা হাউজিংয়ের হাটে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি ধরনের গরুর চাহিদা বেশি। ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মধ্যেই গরু কিনতে আগ্রহী বেশির ভাগ ক্রেতা। বড় গরুর দাম বেশি হওয়ায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতারা।

বছিলা গার্ডেন সিটি হাটে কথা হয় যশোরের ব্যাপারি আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্রেতারা এবার গরুর দাম কম বলছেন। তবে ছোট ও মাঝারি গরুরও আশানুরূপ দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ৮০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন বছিলা ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিংয়ের রফিক উল্যাহ। তিনি বলেন, বিক্রেতারা দাম বেশি বলছেন। তবে বৃষ্টির পাশাপাশি শেষ দিনে দাম বাড়ার আশঙ্কায় তিনি আগেভাগেই গরু কিনেছেন।

মোহাম্মদপুর-বছিলা পশুর হাটে গতকাল পর্যন্ত সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি গরু-ছাগল এসেছে। এ হাটে দেশি জাতের ছোট আকারের গরু ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বিদেশি জাতের এবং দেশি-বিদেশি সংকর জাতের গরুর দাম আকারভেদে এক থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। এই হাটে উট, মহিষ ও ভেড়াও দেখা গেছে।

এদিকে, পশু বিক্রেতাদের দাবি, এখন পর্যন্ত ছাগলের বেচাকেনা কম। দামও খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। গাবতলী হাটে গতকাল একেকটি ছাগল গড়পড়তা ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এই হাটে প্রায় পাঁচ হাজার ছাগল বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। এর মধ্যে বিক্রি হয়েছে মাত্র পাঁচ শতাধিক। মোহাম্মদপুর টাউন হলের উল্টোপাশে পার্কের মধ্যে বসেছে ছাগলের হাট। এই হাটে কয়েক হাজার ছাগল থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।

বিষয় : রাজধানী পশুর হাট জমে উঠেছে পশুর হাট

মন্তব্য করুন