সুন্দরবন বিশ্বের সম্পদ। এটিকে রক্ষা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সুন্দরবনের প্রাকৃতিক স্বার্থ বাদ দিয়ে সরকার ভূ-রাজনৈতিক ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

সোমবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন।

জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় সুন্দরবন সম্পর্কে গৃহীত সুপারিশ নিয়ে মতামত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভাটি ১৬ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হবে ৩১ জুলাই। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভার বিষয়ে প্রায় সব বক্তাই তাদের হতাশা ব্যক্ত করেন। এই কমিটিকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে বলেও অভিমত দেন একাধিক বক্তা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত আগামী বছর নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এবার আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশ শর্তগুলো পূরণ না করলে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য বা লাল তালিকাভুক্ত করা হবে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবনের আশপাশে নানা স্থাপনা নিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির উদ্বেগ ছিল। কিন্তু ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের খসড়া প্রস্তাবে এ বছর সিদ্ধান্ত না নেওয়ার সুপারিশ করে জানিয়েছে, আগামী সম্মেলনের আগে বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে। ওই সভায় চীন, রাশিয়া, মিসরসহ নানা দেশ বাংলাদেশের সমর্থনে কথা বলে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ায় বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির আগামী সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশকে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে আগামী বছর ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, সুন্দরবন নানা কারণে আজ বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি দেশের ও জনগণের স্বার্থে হচ্ছে, নাকি মুষ্টিমেয় মুনাফালোভীর স্বার্থে হচ্ছে- জাতিকে তা বুঝতে হবে। তবে আমরা হতাশ নই। সুন্দরবন রক্ষায় লড়াই চালু থাকবে। এখানে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সমর্থন দরকার। কারণ, সুন্দরবন বৈশ্বিক সম্পদ। সুন্দরবন ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিজেদের একটি শক্ত মনিটরিং টিম গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ওয়াচের চেয়ারম্যান স্টিফান ডম্পকে বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির অধিবেশন চলার সময় আমরা কার্যত শক্তিহীন ছিলাম। সুতরাং জনসাধারণের দ্বারা চাপ সৃষ্টি করা ও সচেতনতা বাড়ানো এখন অবশ্যকরণীয়।

জেনেভায় জাতিসংঘে আর্থ জাস্টিসের স্থায়ী প্রতিনিধি ইভস লেডর বলেন, জনগণের মতামত এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিরুদ্ধে গিয়ে ইউনেস্কোর মতো বৈশ্বিক মঞ্চে সরকারের পরিবেশবিরোধী কৌশল অবলম্বন করার কারণে বাংলাদেশেরই ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে দেশের মানুষের সমর্থন পায়নি সরকার। তারা বিশ্বের নানা দেশের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হয়েছে। এই লবিংয়ের টাকা তারা কোত্থেকে পাচ্ছে? তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে যখন ভারত, চীন বা রাশিয়া দাঁড়ায়, তখন এ নিয়ে প্রশ্ন থাকে। কেননা, এসব দেশের প্রতিটিরই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আছে। এখানে 'স্বার্থের দ্বন্দ্ব' বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কারণে এসব দেশ সপক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সংগঠক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব, ডা. আবদুল মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল আজিজ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ্‌ হারুন চৌধুরী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান, বেনের সদস্য অধ্যাপক ড. সাজেদ কামাল ও অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম, বাপার কোষাধ্যক্ষ মহিদুল হক খান এবং পশুর রিভার ওয়াটারকিপার নুর আলম শেখ।