ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অশনিসংকেত শুনলেই বাংলাদেশের প্রত্যেক সচেতন মানুষের হৃদয়ের মানসপটে আশার প্রদীপ হয়ে ভেসে ওঠে সুন্দরবন। মহান স্রষ্টা প্রদত্ত প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম সুন্দরবন যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল সংলগ্ন মানুষকে প্রলয়ংকরী ঝড় বা সুপার সাইক্লোনের ছোবল থেকে জীবন রক্ষা করে চলেছে। বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের বৃহত্তম আধার এই ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশের অক্সিজেন ভান্ডার বা ফুসফুস হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে। লাখ লাখ মানুষ সুন্দরবনের মাছ, মধু, গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুন্দরবনের নদী-খাল বাংলাদেশের মাছের চাহিদার একটা বিরাট অংশ জোগান দিচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সরকারও এ বন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

প্রায় এক যুগ ধরে সুপার সাইক্লোন সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান ও সর্বশেষ ইয়াসের ছোবল থেকে সুন্দরবন নিজের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলের মানুষকে রক্ষা করে ক্লান্ত-শ্রান্ত। আগামীতে প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে এক বা একাধিক ঘূর্ণিঝড় উৎপন্ন হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এসব অনাগত ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সুন্দরবনকে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি মহাপ্রলয়ের পর লন্ডভন্ড সুন্দরবন আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুন্দরবন প্রাকৃতিকভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম।

মৎস্যজীবী এবং বনজীবীদের জন্য বনের ভেতর পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। বন বিভাগের অফিস, জেটিসহ সব স্থাপনা ঘূর্ণিঝড় সহনীয় করে নির্মাণ করতে হবে। বনের অভ্যন্তরে বনজীবী ও বন্যপ্রাণীদের খাবার পানির একমাত্র উৎস মিঠা পানির পুকুরগুলোর পাড় উঁচু বাঁধ দিয়ে সংস্কার করতে হবে, যেন জলোচ্ছ্বাসের সময় নোনাপানি ঢুকতে না পারে। জলোচ্ছ্বাসের সময় বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য বনের ভেতর প্রচুর পরিমাণে উঁচু টিলা তৈরি করতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি সময়ের ব্যবধানে কাটিয়ে উঠতে পারলেও মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় সুন্দরবন খুবই অসহায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগুলো বনের জন্য অপূরণীয়। সে জন্য মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দূরীকরণে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এসব দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে বনে আগুন লাগানো, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, বাঘ-হরিণ হত্যা, নৌযান ডুবি, সুন্দরবনের পাশে শিল্পকারখানা নির্মাণ অন্যতম। গত দুই দশকে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২৪ বার। পুড়ে গেছে প্রায় ৮২ একর বন ভূমির গাছপালা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মাছ শিকারের জন্য জায়গা তৈরি, নাশকতা, মৌয়ালদের অসচেতনতায় ফেলে রাখা আগুন, বনজীবীদের বিড়ি-সিগারেটের আগুনকেও দায়ী করা হয়েছে। সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদের জন্য সব থেকে বড় হুমকি হচ্ছে খাল বা নালার মধ্যে বিষ দিয়ে মাছ শিকার। এতে মাছের প্রজনন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, শত শত প্রজাতির মাছ ধ্বংস হচ্ছে, বিলুপ্ত হচ্ছে, সুন্দরবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে এবং শূন্য হয়ে যাচ্ছে আমাদের মৎস্যসম্পদ। আবার বিষযুক্ত মাছ খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি বিষাক্ত পানি পান করে বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সুন্দরবন সুরক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করে বাঘ। একটি অসাধু চক্র বাঘ-হরিণ শিকারে মেতে উঠেছে।

দেশের আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো লাল শ্রেণির শিল্পকারখানা স্থাপন করা যাবে না। যেসব শিল্পকারখানা আছে, সেগুলো দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। আইন অমান্যকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জরুরিভিত্তিতে ইউনেস্কো সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন সংরক্ষণে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর 'কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা' প্রতিবেদন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শেলা নদীসহ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে সব নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যেই যেসব জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

সর্বোপরি বনের ওপর নির্ভরশীল নানা পেশার বনজীবীদের জন্য সরকারকে যুগোপযোগী বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এবং বন-সংলগ্ন জনপদের মানুষের সচেতনতা বাড়াতে তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সভা, সেমিনার, গীতিনাট্য, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হবে। সুন্দরবন ব্যবহারকারীদের বন ও বনজসম্পদ সুরক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও সুন্দরবন এখন বেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে। অতীতে নোনা ও মিষ্টি পানির সংমিশ্রণে সুন্দরীসহ অসংখ্য উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ছিল সুন্দরবন। পদ্মার শাখা নদী গড়াই, মাথাভাঙ্গা, আড়িয়াল খাঁ, মধুমতী, কপোতাক্ষ, চিত্রা, ইছামতী, ভৈরব প্রভৃতি নদী দিয়ে আসা মিষ্টি পানি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর উজান থেকে নেমে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ কমতে শুরু করে এবং এখন অধিকাংশ শাখা নদী ভরাট হয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। মিষ্টি পানির অভাবে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সুন্দরীসহ অনেক গাছ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু বিষয়টি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ওপর নির্ভরশীল, তাই সরকারকে অনুরোধ করব সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সুপেয় পানির উৎস বা সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন
farid.dac@gmail.com