'কাম করি মাইনষের বাসায়। রোববার ছুটি নিয়া আইছিলাম; বৃষ্টিতে ভিজে তিন ঘণ্টা দাঁড়ায়েও টিকা পাই না। আজকেও (সোমবার) ছুটি নিয়া অনেক সকালে লাইন ধরছি। এর পরও টিকা পাইলাম না! দৈনিক তো লাইন ধরা সম্ভব না। বাসাবাড়ির কাম থেইকা কি সব দিন ছুটি দিবে?' চার-পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকা না পাওয়ায় এভাবেই নিজের ক্ষোভ জানালেন রাহেলা খাতুন। রাজধানীর ফার্মগেটের তেজগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে কভিড টিকা নিতে এসেছিলেন তিনি। এ কেন্দ্রের আরও অনেক টিকাপ্রত্যাশী একই প্রতিক্রিয়া জানান। তারা অভিযোগ করেন, পরিচিত ও প্রভাবশালীদের লাইন ছাড়াই টিকা দেওয়ার কারণে সাধারণ জনগণ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও টিকা পাচ্ছে না।
তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে ৩৫০ ডোজ। লাইন ধরছে ৫০০-৬০০ মানুষ। চাপ বেশি থাকায় অনেকেই টিকা পাচ্ছে না। তাই লোকজনকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশজুড়ে চলা এ গণটিকাদান কর্মসূচিতে ধারণার চেয়েও বেশি সাড়া মিলেছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শনিবার শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে ছয় দিনে সারাদেশে ৩৫ লাখ টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম দুই দিনেই তা দেওয়া হয়ে গেছে। বরাদ্দ টিকা কমে আসায় অনেক এলাকায় দৈনিক ডোজের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের একাধিক কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে মানুষ। কিছু কেন্দ্রে বেলা ১১-১২টার মধ্যেই কোটার নির্ধারিত ভ্যাকসিন শেষ হয়ে যায়। কোনো কোনো কেন্দ্রে লাইনের লোককে টিকা দেওয়া নিয়েও ঝামেলা দেখা দেয়। ভিড়ের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই ছিল না।
দুপুর ১২টার দিকে গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের কেন্দ্রে দেখা যায় গেটের বাইরে মানুষের জটলা। দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্য তাদের পরদিন আসতে বলছেন। গোপীবাগ জর্জ গলির বাসিন্দা লুৎফুর রহমান বলেন, এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানতে পেরেছেন- টিকা শেষ হয়ে গেছে। কাল আসতে বলেছে।
এক আনসার সদস্য জানান, টিকা শেষের দিকে। যত ডোজ আছে, ততজন লোক ভেতরে ঢুকিয়ে বাকিদের পরদিন আসতে বলা হয়েছে। তবে আধাঘণ্টা ওই কেন্দ্রে অবস্থান করে দেখা যায়, পরে এসেও অনেকে টিকা পেয়েছেন। সিটি করপোরেশনের পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের সঙ্গে তারা ভেতরে ঢুকছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রে দায়িত্বরত একজন জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে অনেককেই সুযোগ দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর রামপুরার একটি গণটিকা কেন্দ্রে কথা হয় দুলালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভোর ৪টা থেকে অপেক্ষা করে দুপুর সাড়ে ১২টায় টিকা পান। গেটের বাইরে তিনি ৪০ জনের মধ্যে ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু গেটের ভেতরে ঢুকে লাইনের প্রথম জনেরই সিরিয়াল পড়ে ৫০-এর পরে।
তাহলে আগে কারা টিকা পেয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েকজন বৃদ্ধ ঢুকেছেন। বাকি যাদের টিকা দিচ্ছে, তারা পরিচিত বা স্থানীয় প্রভাবশালী। এ সময় বাইরে হইচই শোনা যায়। দেখা যায়, নারীদের লাইনে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। লাইনে থাকা নারীরা সিরিয়ালের বাইরের লোকদের আগে টিকা দেওয়ার অভিযোগ করেন। কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য জানান, টিকা কম; মানুষ বেশি। সবার মধ্যে তাই তাড়াহুড়ো রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, সিরিয়ালের বাইরে কাউকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান বলেন, যারা টিকা পাচ্ছেন না, তারা পরদিন এলে টিকা পাবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ বলেন, আরও তিন দিন প্রতি কেন্দ্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ৩৫০ জনকে টিকা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, চাহিদার চেয়ে জোগান কম থাকায় একটু চাপ যাচ্ছে।