আমাদের প্রজন্মের চোখের সামনে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধউত্তর জাতীয় ইতিহাসের যে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটে গেছে, তা বিস্মৃত হওয়ার অধ্যায় নয়। মুক্তিযুদ্ধের মাঠ থেকে সবে ফিরেছি। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ঢাকার মাটিতে ৯৩ হাজার পরাস্ত পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখনও পাকিস্তানের কারাগারে। আনন্দ-উল্লাসের মাঝেও তাই বিশাল এক শূন্যতা।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল নামে ছোট্ট এক সংবাদ সংস্থায় যোগ দিলাম। তারিখ ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। ঘটনাচক্রে সে দিনই পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার পেশাগত জীবনের প্রথম 'রিপোর্টিং অ্যাসাইনমেন্ট'ও; ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর সংগ্রহের কাজ দিয়ে। সম্পাদক চৌধুরী আবুল ফজল মোহাম্মদ হাজারীর কল্যাণে সুযোগাটা হাতছাড়া হয়নি আমার।

সদ্য স্বাধীন দেশে জাতির পিতার সরকারকে আঘাত করতে যে অস্ত্রটির বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ভারত প্রসঙ্গ। বলা হচ্ছিল, ভারতীয় মিত্রবাহিনী, যারা মুক্তিবাহিনীর হাতে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, তারা বাংলাদেশের মাটি থেকে কখনও নিজ দেশে ফিরে যাবে না। কিন্তু সত্য এই যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ়চিত্ত অবস্থানে মাত্র দুই মাসের মাথায় ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশের মাটি থেকে নিজেদের দেশে ফিরে গিয়েছিল।

আজ ২০২১ সালের ১৫ আগস্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন পেছনের দিকে তাকাই, মনে হয়, পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তি দিতে কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রই জন্ম দিতে চাননি বঙ্গবন্ধ; তাকে আধুনিক, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্টম্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনের স্বাধীনতাবিরোধী অংশ, এমনকি তার দলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারীরা তখন চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিল। যার মধ্য দিয়ে রুদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল নবীন বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বাভাবিক পথযাত্রা।

বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন ১৫ আগস্ট। সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র আমি, কলাবাগান ফার্স্ট লেনের ভাড়া বাড়িতে থাকি। অস্বাভাবিক কিছু আন্দাজ করে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে কলাবাগান ফার্স্ট লেন ধরে হাঁটতেই অনেকের সঙ্গে দেখা। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। বিস্তারিত বলতে না পারলেও সবাই বলাবলি করছে- ৩২ নম্বরে, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গোলমাল শুরু হয়েছে। বিশদ কিছু জানে না কেউ। এগিয়ে গেলাম মিরপুর রোডের দিকে, ধানমন্ডি মাঠের সামনে। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা গেল, রাস্তায় একটা কালো ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন সৈন্য উত্তেজিত স্বরে লোকজনকে দূরে থাকতে বলছে।

তখন ভোর। রাস্তায় লোকজন দেখা যাচ্ছে না। সৈন্যদের উত্তেজিত কথাবার্তায় গলির ভেতরে এসে দাঁড়াই। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কী ঘটেছে- জানার চেষ্টা করতে থাকি। অল্পক্ষণেই জানা গেল, বঙ্গবন্ধুকে সেনাবাহিনীর লোকজন হত্যা করেছে। আরও দেখা গেল, মিরপুর সড়কে অবস্থানরত সৈন্যরা সে খবরে আনন্দ প্রকাশ করছে।

এ এক অবিশ্বাস্য খবর, যা কেউ কল্পনা করতে পারেনি। কোনো বাঙালি হত্যা করবে জাতির পিতাকে! কীভাবে সম্ভব!

সময় গড়াতে থাকে। রেডিওতে মেজর ডালিম নামে একজনের ঘোষণায় হত্যার সত্যতা মিলল। দ্রুত চলে আসি বাসায়। আমাকে ধরে মা কাঁদতে শুরু করলেন। ছোট বোন দু'জন জোরে কাঁদতে থাকল। মা বললেন- কোনো ভুল নাই রে; রাজাকাররাই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে মারল। বলেই তিনি আবার কেঁদে উঠলেন এবং আমি যেন কিছুতেই বাড়ির বাইরে না যাই তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেন।

প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে জর্জরিত করতে থাকে। ভাবি, হয়তো এখনই সেনাবাহিনীর মূল অংশ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হয়তো এখনই রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা ব্যারাক থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসবে। হয়তো এখনই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলে নামবে। মক্তিযুদ্ধপন্থি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের লোকজন মাঠে নামবে; প্রতিরোধ তৈরি করবে। হয়তো এখনই বিমানবাহিনী হত্যাকারীদের অবস্থানে বোমা ফেলবে।

কিন্তু কিছুই ঘটল না। অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অনেক কষ্টে মাকে বুঝিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। দেখি, অনেক মানুষই বেরিয়েছে। কারও মুখে কথা নেই। দু-চারটা রিকশার শব্দ ছাড়া গোটা এলাকা বিরান। এর পর হাঁটতে হাঁটতে পুরানা পল্টনের বাসস কার্যালয়ে ঢুকি।

আবুল বাসারসহ অফিসের টেলিপ্রিন্টার অপারেটরদের একজন তখন এসে গেছে। অফিস ক্লিনার রামুকেও দেখা গেল। সবাই কাঁপছে। সাব-এডিটর কাজী মকসুদুল হাসানের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই চোখ ভিজে উঠল আমাদের। কেউ কিছু বলতে পারলাম না। একের পর এক ফোন আসতে থাকল। লোকজন ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে আগ্রহী। আমরা নবীনরা স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।

সামান্য পরেই অফিসের জানালা দিয়ে শোরগোলের আওয়াজ শোনা গেল। হুমড়ি খেয়ে সবাই সড়কের দিকে তাকালাম। দেখলাম, পুলিশ-মিলিটারির কয়েকটা গাড়ি দ্রুত প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বায়তুল মোকাররম পেরিয়ে বঙ্গভবনের দিকে ছুটে গেল।

কয়েক মিনিটের মাথায় দেখা গেল সামরিক যান বেষ্টিত একটি কালো গাড়িতে খুনি মোশতাক যাচ্ছে। দোতলা থেকে স্পষ্ট দেখা গেল লোকটার টুপি ও শেরওয়ানি। হাত নেড়ে রাস্তার মানুষকে নিজের পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছে। আরও দেখা গেল- পরের গাড়িগুলোতে তাহের ঠাকুরসহ মোশতাকের ঘনিষ্ঠ সহচররা বসে আছে। পরে শুনেছি- মোশতাক ও তার দলবল শাহবাগের রেডিও ভবন থেকে বেরিয়ে বঙ্গভবনের দিকে যাচ্ছিল, যে বঙ্গভবন থেকে প্রায় তিন মাসের 'ক্ষমতা' ভোগ করে তার আর বাইরে বেরোনোর সাধ্যি হয়নি!

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সেদিনের ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে খুনি বাহিনীর আধিপত্য দিন কয়েকের জন্য বন্ধ হলেও পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল, মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ বীর সেনানায়ক খালেদ টিকে থাকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের আরেক অসামান্য সেনানায়ক কর্নেল আবু তাহের, আমার নিজের যুদ্ধাঞ্চল ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক, যিনি সৈনিকদের বন্দিশালা থেকে জে. জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন, তিনিও ব্যর্থ হলেন। সফল হলো জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে সেনানিবাসের ষড়যন্ত্রকারীরা। তখন থেকেই শুরু নতুন সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ভয়ংকর নবযাত্রা।

এ সবই আমাদের প্রজন্মের চোখে দেখা স্মৃতি। ভয়ংকর সেই ব্যর্থতার কথা আজও ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি সেই কলঙ্কের কথা, যে কলঙ্ক মুছতে ব্যর্থ হয়েছিল আমাদের সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, রক্ষীবাহিনীসহ সব বাহিনী; একই সঙ্গে রাজনীতিবিদসহ সেদিনকার ক্ষমতাসীনরা।

৮ ডিসেম্বর ১৯৯০-এ ঘটল আরেক ঘটনা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে গেলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। দুই সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদক হিসেবে আমরা দু'জন। সে ছিল এক মহালগ্ন নতুন ইতিহাসের। এ কারণেই যে, ঘাতকদের বুলেটে ঝাঁজরা হওয়া বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা শরীরকে এই টুঙ্গিপাড়াতেই কবর দেওয়া হয়েছিল, যেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান জানাতে যায়নি কেউ!

আমরা দেখলাম, সেদিনকার কেবিনেট সেক্রেটারি এম কে আনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন। জাতির পিতাকে স্যালুট জানাল এক দল সৈনিক। সমবেত জনতার মধ্য থেকে একযোগে আওয়াজ উঠল- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ধীরে এগিয়ে, মাথা অবনত করে শ্রদ্ধেয় তোয়াব খানসহ গণমাধ্যমকর্মীরা জাতির পিতার কবরের পাশে দাঁড়ালাম। নিঃশব্দে এগোলাম। ভেবে চললাম- বঙ্গবন্ধুর দেহকে ঢাকায় রাখার সাহস পায়নি ঘাতকরা। সমাহিত করেছিল টুঙ্গিপাড়ার এই পাড়াগাঁয়ে। সেই টুঙ্গিপাড়া আবারও জেগে উঠছে। হয়তো এই টুঙ্গিপাড়াই একদিন হবে বাঙালির আরেক তীর্থভূমি, যেখানে এসে যুগ যুগ ধরে প্রিয় বাংলাদেশকে রক্ষা করার নির্দেশ গ্রহণ করবে বাঙালি।

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক