শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছেন, খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রেই নকল পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফুটপাত থেকে শপিংমল পর্যন্ত নকল পণ্য বিক্রির নেটওয়ার্ক। এ অবস্থায় নকল পণ্যের দৌরাত্ম্য কমানোর বিকল্প নেই। এ জন্য শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নকল পণ্য প্রতিরোধে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমাজসেবীদের বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সমকালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নকল পণ্যের সামগ্রিক বিষয়টি শুধু নেতিবাচক প্রভাবেরই জন্ম দেয়। এর কোনো ভালো দিক বা ইতিবাচক বিষয় নেই। তাই নকল প্রতিরোধে শুধু উৎপাদক কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। নকল পণ্য প্রতিরোধে আইনি কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী ও কার্যকর রয়েছে। তার পরও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেছেন, রাতারাতি নকল পণ্য বন্ধ করা অসম্ভব। নকল ও ভেজাল পণ্য রোধ করা জাতির জন্য চ্যালেঞ্জ। শুধু পণ্য কেন; নকল ডাক্তার, নকল র‌্যাব, নকল সাংবাদিক, নকল সার্টিফিকেট, নকল ম্যাজিস্ট্রেটও পাওয়া যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। দেশে এমন কিছু নেই, যার নকল নেই! তিনি বলেছেন, নকল পণ্য প্রতিরোধের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো আইন প্রয়োগ করা। আরেকটি সচেতনতা বাড়ানো। শিল্প মন্ত্রণালয় এ দুটি বিষয়েই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে।
প্রশ্ন :সমকালের উদ্যোগে নকল পণ্যবিরোধী প্রচারাভিযান চলছে। এই উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর :নকল পণ্য নীরব ঘাতক। তাই নকল পণ্য বর্জনের জন্য সমকালের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে খুবই জনগুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় ও অভিনন্দনযোগ্য। 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না'- এ স্লোগানটিও দারুণ তাৎপর্যপূর্ণ। আমি শুরু থেকেই এর সঙ্গে আছি। সমকালের এই প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। তবে নকল পণ্য বন্ধে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, এ জন্য তৃণমূল পর্যন্ত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তা হলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সচেতনতা তৈরি হলে ভোক্তা নিজেই নকল পণ্য কিনবেন না।
প্রশ্ন :প্রসাধনী, ওষুধ, সিগারেটের ব্যান্ডরোল, ইলেকট্রনিকসসহ নানা পণ্য নকল হচ্ছে। নকল পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি রোধে বিএসটিআইর ভূমিকা কতটুকু? এ প্রতিষ্ঠানটি আর কী কী করতে পারে?
উত্তর :নকল যারা করেন, তারা অসৎ হলেও মেধাবী। এই নকলবাজরা তাদের মেধা খারাপ কাজে ব্যবহার করছেন। তাদের কারণে ভোক্তারা মানহীন পণ্য পাচ্ছেন। উৎপাদকরা বাজার হারাচ্ছেন। দেশ রাজস্ব হারাচ্ছে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকে অনুৎসাহিত করছে। এসব কারণে বিএসটিআই অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখেছে। আসলে নকল প্রতিরোধে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং আমদানি পর্যায়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দরকার। সেইসঙ্গে দোষীদের শাস্তি দেওয়া এবং নকলবাজদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপদ পণ্য কিনতে পারাটা ভোক্তার অধিকার। ভোক্তার এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাই জনপ্রিয় পণ্য নকলকারীদের অশুভ চক্র ভাঙতে হবে। উৎপাদক ও ভোক্তার সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। নকল প্রতিরোধে ব্যবহূত পণ্যের মোড়ক ধ্বংস করাও একটি উপায় হতে পারে। সেইসঙ্গে বিএসটিআইর মনিটরিং আরও বাড়াতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিজেদের পণ্যের নকল প্রতিরোধে সক্রিয় হতে হবে। নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নকল হয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে কিনা, অর্থাৎ মার্কেট সার্চ করে তা দেখতে হবে। সব মিলিয়ে নকলের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে আরও কাজ করতে হবে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে।
প্রশ্ন :নকল পণ্য প্রতিরোধে উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর :নকল পণ্য এমন পর্যায়ে গেছে যে, ভোক্তাদের একটি বড় অংশ নৈরাশ্যবাদী হয়ে পড়েছে। ভোক্তাদের আরেকটি অংশ অবশ্য অসচেতন। তারা এগুলো সহনীয় মনে করছেন। তাই ভোক্তাদের আসল পণ্য চেনানোর বেলায় ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্যের হরেক রকম চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। আবার নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল-ভেজাল ও মানহীন পণ্য ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে। এতে ক্রেতারা নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় নকল ও ভেজাল পণ্য ঠেকাতে সরকারের ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। নকল পণ্য প্রতিরোধের দায় রাষ্ট্রের একার নয়। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর নকল পণ্য প্রতিরোধে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। তবে সাদা কাপড় পরা মানুষ মনের দিক থেকে সাদা হলে দেশ থেকেও নকল পণ্য উঠে যাবে। আর নকল পণ্যের বাজারজাতকারীদের ধরার বেলায় বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সেইসঙ্গে নামিদামি কোম্পানির নকল পণ্য জব্দ হলে এর সঙ্গে জড়িতরা যাতে শাস্তি পায়, তা নিশ্চিত করতে ওই কোম্পানির পক্ষ থেকেও আইনি সাপোর্ট দিতে হবে। নকল পণ্য ব্যবহার কিংবা কেনা থেকে তাদের বিরত রাখার জন্য ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা কর্মসূচি থাকতে হবে। কোন পণ্য সঠিক, তা নিরূপণের বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে নিজেদের ব্র্যান্ড যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ভোক্তাদের নকল পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব জানাতে হবে। উৎপাদক কোম্পানিগুলোর এমন কোনো অভিনব সিল, চিহ্ন কিংবা বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করতে হবে, যা দেখে ক্রেতা সহজেই আসল পণ্য চিনতে পারে। বার কোড বা কিউআর কোডসহ যে কোনো ডিজিটাল কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। ভোক্তাদেরও মনে রাখতে হবে, মানসম্পন্ন পণ্যের জন্য সঠিক দাম দিতে হবে। কম দামে কিনতে গিয়ে নকল পণ্য কিনছেন কিনা, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
প্রশ্ন :নকল পণ্য প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম জোরালো করতে আপনার পরামর্শ কী? এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে কী কী করতে হবে?
উত্তর :নকল পণ্য প্রতিরোধে আইন রয়েছে। তবে সে আইন যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর নকল পণ্যবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। আবার আইনের কঠোরতার পাশাপাশি সমস্যার সমাধানও করতে হবে। নকল, ভেজাল, নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের কারণে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণনাশের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই নকল পণ্য ঠেকানোর জন্য আর্থিক জরিমানা বাড়ানো যেতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নকল প্রতিরোধের জন্য চলমান আইন বাস্তবায়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব সক্রিয়ভাবে পালনের মধ্য দিয়ে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথেষ্ট সক্রিয়ভাবে নকল প্রতিরোধে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। এ ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে। নকল পণ্য উৎপাদন পর্যায় ছাড়া ধরা কঠিন। কারণ, নকল করার পর লেবেল দেখে সেটা জানা কঠিন। আবার নকলকারীরা কৌশলও পরিবর্তন করছে। স্থান পরিবর্তন করছে। তারা রাতে কাজ করে। রাতে যেহেতু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সুযোগ নেই, নকলকারীরা সে সুযোগ নিচ্ছে। তাই যেসব বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের কারখানা করতে দেবেন, তাদের দায় নিতে হবে। যারা কারখানার জন্য বাড়ি ভাড়া নেবেন, তাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি আছে কিনা, সেটা যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে পণ্য উৎপাদন কারখানায় বিএসটিআইর লাইসেন্স আছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে।
প্রশ্ন :নকল পণ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
উত্তর :পণ্য উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি পর্যায়ে নকল হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে। নকল পণ্যের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ঐকমত্য রয়েছে। সুতরাং সবাই মিলে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হবে। বিভিন্ন সংস্থা নকল পণ্য প্রতিরোধে কাজ করছে। এরপরও নকল পণ্যের বিক্রি ঠেকানো যাচ্ছে না। এই প্রবণতা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে সামাজিক সচেতনতার জায়গায় শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভোক্তার সচেতনতা বাড়াতে হবে। নকল প্রতিরোধে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এলে শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশ থেকে নকল পণ্যের কারখানা নির্মূল করা যাবে। অনেক জায়গায় নকল কারখানা ধরা পড়ছে। তাই নকল পণ্য তৈরিতে যেসব মেশিন ব্যবহূত হচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করতে হবে। নকল করতেও বিনিয়োগ দরকার। সেই বিনিয়োগ নষ্ট হলে নকলকারীরা নিরুৎসাহিত হবে। সেইসঙ্গে যারা নকল পণ্য তৈরি কিংবা বাজারজাত করেন, তাদের মূলধারার ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। নকলকারীদের সৎ ব্যবসার সুযোগ দিতে হবে। প্রকৃত ব্যবসার সুযোগ পেলে তারা ভালো করবে। তাতে দেশের লাভ হবে। অর্থাৎ সার্বিক জনসচেতনতার মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা যাবে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে নকল পণ্য উৎপাদন, ক্রয় ও ব্যবহার বর্জন করতে হবে।
প্রশ্ন :শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে আগামীতে নকল ও ভেজাল পণ্য প্রতিরোধে কী কী উদ্যোগ থাকবে?
উত্তর :নকলের বিস্তৃতি অনেক। সার, বীজ, খাদ্য, সফটওয়্যার, দলিল, টাকা- সবই নকল হচ্ছে, যা সত্যিই আতঙ্কজনক। এতে জাতীয়ভাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং নষ্ট হচ্ছে। জাতির সার্বিক সুনাম ও সুখ্যাতির ক্ষতি হচ্ছে। নকলের ব্যাপ্তি যেমন বড়, ক্ষতির দিকটাও বড়। তাই শিল্প মন্ত্রণালয় নকল প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিভিন্ন ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। শিল্প মন্ত্রণালয় প্রতিদিনই নকল পণ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করে নকলবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আগামীতে এ কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানো হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ঔষধ প্রশাসন বিভাগকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ থাকবে।

বিষয় : নকল পণ্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ

মন্তব্য করুন