সন্তান-সংসার সামলে রুমা আক্তার পড়ালেখাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি কলেজে সম্মান শেষ বর্ষে পড়তেন তিনি। কিন্তু স্বামী আব্দুল অহিদ সন্দেহ করতেন স্ত্রীকে। ধারণা করে আসছিলেন, রুমার সঙ্গে কারও সম্পর্ক রয়েছে। এজন্য পড়ালেখাও বন্ধ করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সোমবার মধ্যরাতে বাসার তালা ভেঙে রুমা ও শিশুসন্তান রিশাদের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দু'জনের মরদেহ খাটের ওপর পড়ে ছিল, মাথায় আঘাতের চিহ্ন।
ঘটনার পর থেকে অহিদ পলাতক রয়েছেন। তবে একটি ডায়েরিতে তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে খুন করার স্বীকারোক্তি লিখে পালিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। ডায়েরিতে অহিদ দাবি করেছেন, স্ত্রী অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলতেন কারও সঙ্গে। এজন্যই এমন পরিণতি হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগ এলাকার ১৯২ নম্বর বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকতেন অহিদ-রুমা দম্পতি। অহিদ কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের কাজ করেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রুমা ও রিশাদকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে।
প্রতিবেশীরা বলছেন, অহিদ ও তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও বাসাটিতে অহিদের বাবা-মা থাকতেন। তবে তারা দাবি করেছেন, ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন না।
অহিদের বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি বিভিন্ন বাসায় গিয়ে ছেলেমেয়েদের আরবি পড়ান। তার স্ত্রীও বাসায় গিয়ে টিউশনি করেন। সোমবার দুপুরের খাবার খেয়ে তারা দু'জন বেরিয়ে যান। রাত ৯টার পরে বাসায় ফিরে দেখেন, বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ছেলের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাচ্ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে প্রতিবেশীদের খবর দেন। এক পর্যায়ে পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়। তালা ভেঙে ভেতরে পুত্রবধূ ও নাতির লাশ দেখতে পান।
আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই স্বামী-স্ত্রীর কলহ চলছিল। সংসারে যে ধরনের ঝামেলা হয়, এর বাইরে বড় কিছু তাদের চোখে পড়েনি। তবে ছেলের আয় একেবারে কমে যাওয়ায় একটা অশান্তি ছিল। এমন অঘটন ঘটবে তা তারা বুঝতে পারেননি।
তবে নিহত রুমার স্বজনরা দাবি করছেন, রুমার কলেজে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শ্বশুরপক্ষ। রুমা কথা না শোনায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
রুমার ছোট ভাই সালমান নাফিজ সমকালকে বলেন, তার বোনকে মোবাইল ফোনই ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না। তাহলে হোয়াটসঅ্যাপে অনৈতিক সম্পর্ক করত কীভাবে? কোনো বান্ধবীর সঙ্গে কথা বললেও তার বোনের স্বামী সন্দেহ করতেন। এটা তার একটা রোগে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আসলে কলেজে পড়ালেখা বন্ধ করতে না পারাতেই তার বোন ও ভাগ্নেকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। খুনের পর অহিদ ডায়েরিতে তা স্বীকার করে উল্টাপাল্টা লিখে গেছে।
নাফিজ বলেন, ২০১৯ সালের পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের পর তার বোন খুব একটা শান্তিতে ছিলেন না। অহিদ অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করলেও করোনার কারণে তা কমে এসেছিল। এজন্য সে খিটখিটে হয়ে পড়েছিল। এসব কারণে অহিদের সংসার থেকে তারা বোনকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু রুমা নিজেই তাতে রাজি হননি। বলেছেন, তার সন্তান বড় হলে বাবার বিষয়ে জবাব দেবে কী? এজন্য কষ্ট হলেও সংসারটা আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। এখন হত্যা করে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে।
রুমার মা রেবা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে তার মেয়ে সব কষ্ট মেনে নিয়েছিল। রিশাদের জন্মের পর থেকে সব খরচই চালাচ্ছিলেন তারা। স্বামীর অভাব-অনটনের জন্য পড়ালেখা শেষ করে রুমা চাকরি নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। সেই মেয়েটাকেই শেষ করে দিল।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওই বাসা থেকে হাতুড়ি, বালিশ, ডায়েরিসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। থানায় মামলা হয়েছে। পলাতক অহিদকে গ্রেপ্তার করা গেলে সব রহস্য উদ্ঘাটন হবে।
ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে তারা জেনেছেন অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে সংসারে অশান্তি ছিল। ওই ঘটনার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তবে একটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে ধরনের বিষয় থাকতে পারে, এর সব মাথায় নিয়ে তদন্ত চলছে।

বিষয় : যাত্রাবাড়ীতে মা-ছেলের লাশ

মন্তব্য করুন