মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৬ এপ্রিল সাভারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সাবেক ভিপি, বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি। ছাত্রজীবন থেকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য ৫০ বছরের বেশি সময় নিরলস রাজনৈতিক সংগ্রামে নিয়োজিত তিনি। সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপে কথা বলেছেন কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনা, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে। সমকালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার করে একটি দলের ভোট প্রাপ্তির শতাংশের হিসাবে জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক আসন বরাদ্দের ভিত্তিতে নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর রূপরেখাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রশ্ন: গত প্রায় দুই বছর কভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি যাচ্ছে। আলোচনাটা তাই এ প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করছি। আপনার দীর্ঘদিনের রাজনীতির অভিজ্ঞতায় মহামারি পরিস্থিতিকে কীভাবে বর্ণনা করবেন? বাংলাদেশ কতটা সফলভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পেরেছে?

উত্তর: আপনি ঠিকই বলেছেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই কভিড-১৯ মহামারির বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। ফলে মোকাবিলা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। মহামারি কতদিন চলবে, সামনে অবস্থা আরও কী দাঁড়াবে, সেটাও গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে রয়েছে। আমি সাধারণভাবে বলতে চাই, কভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, যৌথ প্রচেষ্টা ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, বিশ্ব যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে মুষ্টিমেয় একটি ধনিক, মুনাফালোভী শ্রেণির কর্তৃত্ব চলছে। এই মুনাফালোভী শ্রেণির কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে মুনাফাই বড়। এমনকি তারা জানে, করোনাভাইরাসে যে কেউ সংক্রমিত হতে পারে এবং অনেক বড় পুঁজিপতিও এই ভাইরাসের শিকার হলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। অথচ অবাক বিষয় হচ্ছে, মুনাফালোভীরা নিজেদের জীবনও সংশয়ের মধ্যে রেখে, বলা চলে আত্মঘাতী হয়েও এই মহামারিতে লাভের হিসাব করছে। এ কারণেই সফলভাবে কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে শুধু মূল্যবান প্রাণহানিই হয়নি, কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। এমনকি জীবন রক্ষায় অতি জরুরি ভ্যাকসিন নিয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, তার ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিপর্যয়কর গণবিরোধী চরিত্র আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে?

উত্তর: আমাদের দেশে কভিড-১৯ পরিস্থিতি যেভাবে মোকাবিলা করা দরকার ছিল, সেভাবে করা হয়নি। মহামারির শুরুতেই সিপিবির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কর্মকৌশলের একটা রূপরেখা তুলে ধরে বলা হয়, এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা নিশ্চিত করার উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি তরুণ স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপকে এক সপ্তাহের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হোক। একই সঙ্গে পাড়ায়-মহল্লায় একটি নাগরিক কমিটি হবে। সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে এই তরুণরা পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে মানুষকে মহামারি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করবে। মহল্লার নাগরিক কমিটির মাধ্যমে একটি গণজরুরি খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ভান্ডার তৈরি করা হোক, যারা এই পরিস্থিতিতে বেকার হয়ে পড়ছে, যারা খাদ্য সংকটে আছে, তাদের ভান্ডার থেকে খাবার দেওয়া হোক, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হোক। চিকিৎসক, নার্সসহ যারা ফ্রন্টলাইনার আছেন তাদের প্রণোদনা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করে মানুষকে যথাযথ সেবা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক।

কিন্তু সরকার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। ফলে বড় আকারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, শুধু করোনার চিকিৎসা নয়, অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও মানুষ পায়নি। বরং সরকারি পর্যায়ে ফ্রন্টলাইনারদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী কেনা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। কভিড-১৯ পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো গলাকাটা বাণিজ্য করেছে, এখনও করছে। ভ্যাকসিন সংগ্রহ নিয়েও একটা অরাজকতা হয়েছে। মুনাফালোভী গোষ্ঠীর ভ্যাকসিন ব্যবসা নিশ্চিত করতে গিয়ে সময় মতো ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি। এর ফলে পুরো মহামারি পরিস্থিতির জটিলতায় দেশের মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে, মহামারি পরিস্থিতিতে প্রায় তিন কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে দেখা যায়, বর্তমানে ৯৪ হাজার মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক কোটির ওপর টাকা আছে। শুধু এই মহামারি পরিস্থিতিতে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১১ হাজার ৬০০ জন। অর্থাৎ, বাংলাদেশেও সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে জিম্মি করে মুষ্টিমেয় মুনাফালোভী ধনিক শ্রেণি করোনা পরিস্থিতিতেও নিজেদের পকেট ভরেছে। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু ব্যবসায়ী করোনা পরিস্থিতিতে আরও বেশি ধনী হয়েছে।

এমনকি লকডাউন নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয়হীনতা প্রকট আকারে দেখা গেছে। লকডাউন দিয়ে অসহায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের একবার ফুটবলের মতো লাথি দিয়ে গ্রামে পাঠানো হয়েছে; আবার হুট করে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবলে পাল্টা লাথি দেওয়ার মতো করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। গণপরিবহন বন্ধ রেখে কারখানা খুলে দেওয়ার কারণে শ্রমিকদের একশ-দুইশ মাইল হেঁটে পথ পাড়ি দেওয়ার চিত্র দেখতে হয়েছে। এটা ভয়ংকর অমানবিক আচরণ। আমরা শ্রমিকদের সরাসরি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য বলেছিলাম। সেটা কঠিনও ছিল না। সরকার মালিকদের মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শ্রমিকরা কষ্টের সময় সেই সাহায্য পায়নি। নাগরিক কমিটি না করে গ্রামে গ্রামে আমলা ও আওয়ামী লীগের লোকজনের মাধ্যমে যে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই লুটপাট হয়েছে, সেটাও দেশের মানুষ জানে।

আমি বলব না যে, সরকার মহামারি মোকাবিলায় প্রচেষ্টা নেয়নি। সরকারের প্রচেষ্টা ছিল; কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় সমন্বয়হীনতা আর মুনাফালোভী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশ্ন: এ সময়ে তো সরকারি দলের রাজনীতিবিদ আর আমলাদের মধ্যে একটা টানাপোড়েনও দেখা যাচ্ছে।

উত্তর: হ্যাঁ, সেটা দেখা যাচ্ছে। তার মূল কারণ দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ এক শতাংশের একটি গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই এক শতাংশের মধ্যে সরকারের রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী এবং সুবিধাভোগী আমলারাও আছেন। এখন দেখা যাচ্ছে এক শতাংশের মধ্যেই স্বার্থের একটা দ্বন্দ্ব। এই তো কয়েক দিন আগে সংসদেও বিষয়টা এসেছে। আমি তোফায়েল আহমেদকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। বাংলাদেশের জন্য তার অবদান অনেক। তিনিও জাতীয় সংসদে আমলাতন্ত্রের কাছে রাজনীতিবিদদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে তাকে বলতে চাই, যখন তারা জনগণের শক্তির কথা ভুলে নৈশকালীন নির্বাচন করেছিলেন, তার আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন করেছিলেন, তখন কি তারা এই আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার করেননি? এটা তো বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, আমলাতন্ত্রকে দিয়ে যখন একটা ছলচাতুরীর নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে, তখন সেই আমলাতন্ত্র একটা সময়ে প্রবল কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠবে, নিজেরাই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হওয়ার চেষ্টা করবে। যেভাবে রাষ্ট্র কাঠামো চলছে, তার ফলে রাজনীতি একটা ব্যবসা হয়ে যাচ্ছে। আমি এমপিদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, অনেক ভালো এমপি আছেন; কিন্তু ২০১৪, ২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় এমপিত্বই এখন বড় ব্যবসা। কোনো রকমে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি হলেই শূন্য থেকে কোটিপতি কিংবা কোটিপতি থেকে শতকোটি টাকার মালিক। ফলে রাজনীতিতে রাজনীতিবিদরা আর থাকছেন না, বরং ব্যবসায়ী আর আমলতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে আমলাতন্ত্রের কার্যকর সক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের যে কল্যাণ করা সম্ভব ছিল, সেটাও হচ্ছে না।

প্রশ্ন: আপনার কথা অনুযায়ী বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটা পরিবর্তন দরকার। কিন্তু সেই পরিবর্তনটা কীভাবে হবে, কোন রাজনৈতিক শক্তি করবে? দেশে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রাধান্য সৃষ্টি হয় ২০০১ সালের পর। কী ধরনের রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশ ও বিন্যাস তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে?

উত্তর: দেখুন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ব্যবহার করেছে। বিএনপি যেমন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে জোট করেছে, আওয়ামী লীগও কখনও খেলাফত আন্দোলনের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে লিখিত চুক্তি করেছে, কখনও হেফাজতকে পাশে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সঙ্গে নেওয়ার কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে পারেনি। বরং গত কয়েক বছরে দেশে হেফাজতের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার সামাজিকীকরণের ব্যবস্থা হয়েছে। নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি, সে অবস্থার যে অবনতি হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে তা স্পষ্ট হয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষতমাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে দেশে বিজ্ঞানমনস্ক, সুস্থ প্রগতিশীল চিন্তার আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুটি দলই সাম্প্রদায়িক শক্তির মাধ্যমে জাতির এ বিপর্যয়ের কথা ভাবছে না।

আমি স্পষ্ট করেই বলতে পারি, দেশে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বামপন্থিরাই। বামপন্থিরা কখনও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করেনি। সিপিবি কখনও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে এক বিন্দু সরে যায়নি।

প্রশ্ন: কিন্তু বামপন্থিরা তো বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত। দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বামপন্থিদের অবস্থান কি আছে? বরং বামপন্থিরা নেতৃত্বশূন্য হয়ে যাচ্ছে, এমন আলোচনাও আছে।

উত্তর: ডানপন্থিরাও তো বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত। তার চেয়ে তো বামপন্থিদের খণ্ড অনেক কম। তবে এটা সত্যি যে, বামপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা জরুরি। একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে চার মূলনীতি সংযোজিত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই ঐক্য গড়তে হবে। সে ঐক্যের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। সেটা যে কোনো সময়ই হতে পারে। সিপিবি বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে।

আর একটা বিষয় বুঝতে হবে, নেতৃত্ব কখনও শূন্য হয় না। নেতৃত্বের বিষয়টা সময়ের মধ্যে এবং সমাজের মধ্যেই সুপ্ত থাকে। যখন প্রয়োজন হয়, জনগণ তার নেতা বেছে নেয়। বঙ্গবন্ধুও কিন্তু সেই প্রয়োজন থেকেই তার সময়ের অন্য বড় নেতাদের ছাপিয়ে নেতৃত্বের শিখরে পৌঁছেছিলেন। ইতিহাসের মহানায়ক হয়েছেন তিনি। জাতির সংকটে, সময়ের প্রয়োজনে আবারও নতুন নেতৃত্ব আসবে- এটাই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেখা গেছে।

অতএব, নেতৃত্বশূন্য হওয়ার প্রসঙ্গটি অবান্তর। আমি খুব স্পষ্ট করে বলতে পারি, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সত্যিকার অর্থে অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে বামপন্থিদের কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: কিন্তু ভোটে বামপন্থিদের প্রতি তো জনসমর্থন দেখা যায় না। ভোটের রাজনীতিতে সফল না হলে বামপন্থিরা দেশের নেতৃত্ব দেবে কীভাবে?

উত্তর: দেশে সত্যিকারের ভোটই তো হয় না। পেশিশক্তি, কালো টাকা, অপপ্রচার আর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ব্যবহার করে যে নির্বাচন হয়, সেটা কোনো নির্বাচন নয়। সেই নির্বাচনের ফল দিয়ে বামপন্থিদের প্রতি জনসমর্থন বিচার করা যায় না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে শুরু করে জনসম্পৃক্ত যত আন্দোলন, তার অগ্রভাগে কিন্তু বামপন্থিরাই আছে। সেখানে কিন্তু মানুষের বিপুল সমর্থনও আছে। কিন্তু ভোটের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা আছে, তার মাধ্যমে সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে না।

আমি বলতে চাই, এখন যে আসনভিত্তিক মনোনীত প্রার্থীদের দিয়ে জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে, সেটা একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় কোনো দল মোট ভোটের বেশি শতাংশ পেয়েও সরকার গঠন করতে পারে না প্রার্থীরা কম আসনে জেতার কারণে। নিকট অতীতেই সেটা দেখা গেছে। এ কারণে এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। একটি দলের ভোট প্রাপ্তির শতাংশ হিসাবে সংখ্যানুপাতিক আসন বরাদ্দের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। এই পদ্ধতি ইউরোপের প্রায় সব দেশে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায়ও আছে। এ পদ্ধতি হচ্ছে, রাজনৈতিক দল একটি জাতীয় কর্মসূচি দেবে। সেই কর্মসূচি দেখে মানুষ বিচার-বিবেচনা করে সেই দলের প্রতীকে ভোট দেবে। দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পাবে। যে দল মোট ভোটারের বেশি শতাংশের সমর্থন পাবে, তারা সরকার গঠন করবে। দলগুলো আসনওয়ারি নয়, মোট সংসদের জন্য সুযোগ্য ৩০০ প্রতিনিধির নাম আগে ঘোষণা করবে। প্রতিটি দল প্রাপ্ত সদস্যের ৩০, ৪০ বা ৫০% পর্যন্ত নারী সদস্য দেবে, যা নির্ধারিত থাকবে। এতে নারীর ক্ষমতায়নও সহজ ও দ্রুত হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশন প্রতিটি দলের নির্বাচনী ইশতেহার এবং পোস্টার ছেপে দেবে। এর ফলে মনোনয়ন বাণিজ্য এবং প্রচারে পেশিশক্তি, কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ হবে। এমপি হিসেবে কালো টাকার মালিকের পরিবর্তে শিক্ষা, সততা, নেতৃত্বের গুণাগুণ মূল্যায়িত হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা এমপি হিসেবে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। একটা সত্যিকারের জনমতের প্রতিফলন নির্বাচনের ফল থেকে পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশনের যে কাঠামো, তা দিয়ে কি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব?

উত্তর: আগে নির্বাচন পদ্ধতি বদলাতে হবে। নির্বাচন পদ্ধতি না বদলালে ফেরেশতাদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করলেও তাদের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না। নির্বাচন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের স্বার্থে নির্বাচন ব্যবস্থায় অন্যান্য যে সংস্কার জরুরি প্রয়োজন, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়াও সহজ হবে।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আপনাকেও ধন্যবাদ।