সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃতদেহে বুলেটের তিনটি ছিদ্র ছিল। দুটি গুলি সামনে দিয়ে প্রবেশ করে পিঠের মাঝামাঝি স্থান দিয়ে বের হয়ে গেছে। হৃদপিণ্ডেও দুটি ছিদ্র ছিল। ফুসফুসের বাম পাশ ছিল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। পাঁজরের চতুর্থ ও পঞ্চম হাঁড় ছিল ভাঙা।

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে সিনহার মৃতদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. রনধীর দেবনাথ এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার আরএমও শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে এই জবানবন্দি দিয়েছেন।

বুধবার আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরএমও শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী।আর মঙ্গলবার সাক্ষ্য দিয়েছেন ডা. রনধীর দেবনাথ। এছাড়াও বুধবার আরো সাক্ষ্য দিয়েছেন সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট আইয়ুব আলী। এই সাক্ষীদের জেরাও করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।

আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ডা. রনধীর দেবনাথ বলেন, ২০২০ সালের ১ আগস্ট সিনহার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন পেয়ে আরএমও ডা. শাহীন আবদুর রহমানের নির্দেশে ময়নাতদন্ত করি।

সাক্ষীতে তিনি বলেন, নিহত সিনহার দেহের বাম বাহুতে এবং বুকের বাম পাশে চামড়ার নিচে বড় ক্ষত ছিল। মরদেহে উল্লেখযোগ্য ক্ষতের মধ্যে গলায় সমান্তরাল চারটি অগভীর ক্ষত ছিল। যার নীচে মাংসপেশি ছেঁড়া ছিল। যা ধারালো কঠিন কোনও বস্তু দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে করা হয়েছে।

সাক্ষীকে জেরা করতে ওসি প্রদীপের আইনজীবীর অপারগতা:

বুধবার তৃতীয় দফায় সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ দিনে আদালতে সাক্ষ্য দেন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সার্জেন্ট আইয়ুব আলী। তিনি এই মামলায় ১২তম সাক্ষী। এই সাক্ষীকে জেরা করতে অসম্মতি জানিয়েছেন আসামি প্রদীপের আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত। এ সময় আসামি প্রদীপ নিজে অথবা অন্য কোনও আইনজীবী দিয়ে সাক্ষী আইয়ুব আলীকে জেরা করবেন কিনা- জানতে চান আদালত। জবাবে প্রদীপ কুমার দাশও জেরা করবেন না বলে আদালতকে জানান। তবে এই সাক্ষীকে অন্য সকল আসামির পক্ষে জেরা করেছেন আইনজীবীরা।

আদালতে সার্জেন্ট আইয়ুব আলী বলেন, সিনহা হত্যার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে উপস্থিত ওসি প্রদীপ এবং পুলিশ সদস্যরা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। সার্জেন্ট আইয়ুব ওই রাতের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন আদালতের কাছে।

তিনি আরো বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯ টায় তিনি শামলাপুর চেকপোস্টে পৌঁছে দেখেন পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে। সেখানে ওসি প্রদীপ, লিয়াকত, নন্দদুলাল সহ মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য ছিল।

সার্জেন্ট আয়ুব বলেন, 'চেকপোস্টে চোখ মুখ গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থা লম্বাচুলওয়ালা এক ব্যক্তি ছিল। ফাঁড়ির সামনে দাঁড়ানো একটি খোলা গাড়িতে সেনা পোষাকে এক ব্যক্তি পড়ে ছিল। কাছে গেলে দেখতে পাই তিনি মেজর (অব.) সিনহা। তখন আমি ছবি তুলি। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা আমার পরিচয়পত্র ও মোবাইল কেড়ে নেয়। বিষয়টি আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাই। তারা পুলিশের সাথে কথা বলতে চায়। কিন্তু কোনও পুলিশ কর্মকর্তা কথা বলেতে রাজি হননি। পরে ওসি প্রদীপ আমাকে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রে যেতে বলেন। আমি সেখানে গেলে ঘণ্টা দুয়েক ভেতরে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। এরপর লে. মোনতাসির আরেফিনের নেতৃত্বে দুই পিকআপ সেনা সদস্য বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রে আসেন। তারা তদন্তকেন্দ্রে প্রবেশ করে, সাথে আমিও প্রবেশ করি। ওইসময় পুলিশ আমাদের সকলের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। ওসি প্রদীপ আমাদেরকে বলেন- এখান থেকে চলে যান, কাজ শেষ হলে সব জানতে পারবেন।'

এর আগে বুধবার সকালে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আসামি প্রদীপের আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত এই হত্যা মামলার বিষয়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর তৈরি করা প্রতিবেদন আদালতে তলব করে নথীভুক্ত করার আবেদন করেন। আবেদনের শুনানি করে আদালত তা নাকচ করে দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম বলেন, এই মামলায় তৃতীয় দফায় সাক্ষ্যগ্রহণ বুধবার শেষ হয়েছে। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর। এছাড়া পঞ্চম দফায় ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে বলে আদালত তারিখ নির্ধারণ করছেন।

তিনি বলেন, এই হত্যা মামলায় এই পর্যন্ত ১৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদেরকে জেরাও করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।

অ্যাডভোকেট ফরিদ বলেন, মোট ৮৩ জন সাক্ষীর মধ্যে এই পর্যন্ত ২৩ জন সাক্ষীকে সমন দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন ৪ জন করে সাক্ষী আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। তবে আসামি পক্ষ সাক্ষীদের দীর্ঘ জেরা করার কারণে সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। সাক্ষ্য গ্রহণকালে বুধবারও মামলার ১৫ জন আসামিকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়।