সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছিল, দুই তরুণ এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাচ্ছে। এক পর্যায়ে টার্গেট ব্যক্তি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর একজন হামলাকারী চলে যায়। আর আরেকজন মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার ঘাড়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। গত ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীর ডি ব্লকের ৩১ নম্বর সড়কে এভাবে স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাহিনুদ্দিনকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। তখন সেই হামলার ভিডিও ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় নিহতের মায়ের দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ করে এনেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও তরীকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়ালসহ অন্তত ২১ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের আসামি করে শিগগিরই দেওয়া হবে চার্জশিট।

জমি দখলের জন্য ভাড়াটে কিলারদের ব্যবহার করে এই খুনে মূল ভূমিকা পালন করেন আউয়াল। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মানস কুমার পোদ্দার সমকালকে বলেন, মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে বলা যায়। এখন তথ্য-উপাত্ত সংযুক্তিকরণের কাজ চলছে। শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।

গ্রেপ্তার হয়েছে ১৬: তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত সাহিনুদ্দিন হত্যার সঙ্গে জড়িত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- এম এ আউয়াল, জহিরুল ইসলাম বাবু ওরফে বাইট্যা বাবু, নূর মোহাম্মদ, ইকবাল, নূর, কালা বাবু, ইয়াবা বাবু, মো. বাবু, দীপু, মুরাদ, শরীফ, সুমন বেপারী, টিটু, কিবরিয়া ও রকি তালুকদার। আরও পাঁচজন সন্দেহভাজন পলাতক আসামির প্রকৃত নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানার চেষ্টা চলছে। তাদের প্রকৃত নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে ১৬ জনের সঙ্গে তারাও চার্জশিটে আসামি হবেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছয়জন এরই মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা উঠে আসে। এ ছাড়া সাক্ষী হিসেবে এই মামলায় আরও একজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আউয়াল আদালতে জবানবন্দি দেননি।

মূল ভূমিকায় আউয়াল: ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের টাকার বিনিময়ে কিনে সাহিনুদ্দিনকে হত্যা পরিকল্পনায় মূল ভূমিকা পালন করেন সাবেক এমপি আউয়াল। তদন্তে উঠে এসেছে হত্যার ৪-৫ দিন আগে মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও মামলার প্রধান আসামি আউয়ালের কলাবাগান অফিসে আবু তাহের ও সুমন বেপারী এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। আউয়াল বিষয়টি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেন সুমনকে। তার নেতৃত্বে ১৪-১৫ জনের একটি দল সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়।

তার নির্দেশে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী মনির, মানিক, সুমন বেপারী, হাসানসহ অন্যরা ৫-৭ মিনিটের মধ্যে রামদা ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে সাহিনুদ্দিনকে হত্যা করে। এরপর সুমন মোবাইল ফোনে আউয়ালকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, 'স্যার, ফিনিশ।'

আউয়াল তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব থাকাকালে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে নৌকা প্রতীকে এমপি হন। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাকে তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর পরই তিনি ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তিনি দলটির চেয়ারম্যান।

ডেকে নিতে কৌশল: তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সাহিনুদ্দিনকে ডেকে নিয়ে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। ঘটনার দিন বিকেলে সাহিনুদ্দিন তার সাত বছরের সন্তানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হন। এ সময় পূর্বপরিচিত সুমন বেপারী ও টিটু মোবাইল ফোনে সাহিনুদ্দিনকে ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকের সিরামিকস গেটে দাওয়াত খেতে ডাকে। সাহিনুদ্দিন তার ছেলে মাশরাফিকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। তখন সুমন বেপারী সাহিনুদ্দিনের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়ায়। একপর্যায়ে সুমন লাথি মেরে মোটরসাইকেলসহ সাহিনুদ্দিনকে ফেলে দেয়। এ সময় ১৫-১৬ জন তাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের একটি বাড়ির গ্যারেজে নিয়ে রামদা, চাপাতি ও চায়নিজ কুড়াল দিয়ে শিশুটির সামনে কোপাতে থাকে।

যা নিয়ে বিরোধ: পল্লবীর আলী নগরের বুড়িরটেক এলাকায় সাহিনুদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যদের ১০ একর জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন খাজনা না দেওয়ায় তাদের কিছু জমি সরকার নিয়ে নেয়। পরে তা অবমুক্ত করতে সাহিনুদ্দিনের ভাই মাইনুদ্দিন এমপি আউয়ালের দ্বারস্থ হন। সরকারের কাছ থেকে জমি অবমুক্ত করার বিনিময়ে কিছু জমি আউয়ালের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেন তারা। তবে আউয়াল এতে সাড়া দেননি। পরে তাদের কিছু জমিতে ঘর তুলে 'হ্যাভেলি প্রোপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট' নামে হাউজিংয়ের সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেন আউয়াল। আলীনগরে আউয়ালের দীর্ঘদিন ধরেই হাউজিং ব্যবসা রয়েছে।

এর আগে গত বছরের নভেম্বরে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে সাহিনুদ্দিনের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। ওই ঘটনায় করা মামলায় স্থানীয় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। উল্টো আউয়ালের দেওয়া মিথ্যা মামলায় সাহিনুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক আগে সাহিনুদ্দিন জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পল্লবী থানার তৎকালীন ওসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মনির-মানিক 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত: সাহিনুদ্দিন হত্যা মামলার দুই আসামি 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হন। তারা হলেন মনির ও মানিক। ওই হত্যাকাণ্ডের পর ফুটেজে তাদেরই দেখা গেছে। পুলিশের ভাষ্য, ২৩ মে পল্লবীর সাগুফতা হাউজিং এলাকায় গোলাগুলির সময় মনির নিহত হন। এর আগে রূপনগরে র‌্যাবের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হন এ মামলার আরেক আসামি মানিক। তাদের মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে যে, প্রকৃত ঘটনা চিরতরে চাপা দেওয়ার জন্যই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিনা।