সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী কিশোর অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে আমরা কিশোর অপরাধের ভয়ানক রূপ দেখতে পাচ্ছি। শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা- সর্বত্র কোমলমতি ছেলেমেয়েদের দৌরাত্ম্য লক্ষণীয়। যে বয়সে শিশুদের শিক্ষা অর্জন, চরিত্র গঠন ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত মজবুত করার কথা, সেই বয়সে দেশের শিশুরা বিপথগামী হচ্ছে। যে বয়সে শিশুরা সোনালি স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সে শিশুরা অপরাধী হচ্ছে। কিন্তু কিশোর বয়সে শিশুদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কেন? শিশুরা কেন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে? আজকের শিশু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্ণধার। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যাবে তাদের হাতে। কিন্তু একজন অপরাধপ্রবণ শিশু জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ। অকালেই নিঃশেষ হয় তাদের জীবন। অপরাধপ্রবণ ও আদর্শহীন শিশুরা কি পারবে একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে?
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় কিশোর অপরাধ বেশি হতো শহর, নগর ও শিল্পাঞ্চলে। দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে কেটেছে আমার শৈশব; গাজীপুর বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি আবাসিক এলাকায়। মনে পড়ছে আশির দশকের কথা, যখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। লিটন নামে এক ক্লাসমেট ক্লাসে প্রবেশ করল ছদ্মবেশে। মেয়েদের ড্রেস সালোয়ার-কামিজ ও ওড়না পরে। শিক্ষকমণ্ডলী বিষয়টি জ্ঞাত হলেন। এক শিক্ষক তাকে বকুনি দিলেন প্রচণ্ড এবং সংশোধনের জন্য নৈতিক শিক্ষা দিলেন। ওই সময় তার চুল কাটায় ভিন্নতা, শার্টের বোতাম খোলা, হাতে ব্রেসলেট পরা ইত্যাদি কারণে স্কুলে সে বখাটে হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তা ছাড়া একই কলোনিতে বসবাসকারী মামুন ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। হিন্দি ছবির প্রতি ছিল প্রচণ্ড আসক্তি। পার্শ্ববর্তী সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়ামাত্র বাংলা বা হিন্দি ছবি দেখে শেষ করত। ৮৯ বা ৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। হরতাল চলাকালে সুরক্ষিত বাউন্ডারিতে স্কুল চলছে। অসময়ে বেজে উঠল ছুটির ঘণ্টা। কিছুই বুঝলাম না। শিক্ষকমণ্ডলী হতভম্ব। পরে জানলাম, মামুন ভাই ছুটির ঘণ্টা দিলেন রাজনৈতিক ইশারায়। এ মামুন ভাইয়ের জীবন অকালেই নিঃশেষ হয়েছে।
সময়ের আবর্তে এবং স্থানভেদে কিশোর অপরাধের ধরন-প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। গত শতাব্দীর কিশোর অপরাধের পরিসর ছিল তুলনামূলক ছোট। যেমন : পিতামাতার অবাধ্য, শিক্ষকের অবাধ্য, স্কুল পালানো, স্কুলগামী মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, পরীক্ষায় নকল করা, সিগারেট খাওয়া, জুয়া খেলা ইত্যাদি। কিশোর অপরাধী ও অপরাধের শিকার ব্যক্তির মধ্যেই কিশোর অপরাধ সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান দৃশ্যপট ভিন্ন। কিশোর অপরাধীরা সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধ করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও জাতি, যার অন্যতম উদাহরণ 'টিকটক হৃদয়'। পিতামাতার অবাধ্যতায় সে পরিবার থেকে বিতাড়িত। দালালচক্রের খপ্পরে সে কিছুদিন ভারতে অবস্থান নেয়। সে 'টিকটক হিরো' বানানোর উদ্দেশ্যে তরুণীদের প্রলুব্ধ করে। লক্ষ্য স্বল্প শিক্ষিত ও দরিদ্র তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে ভিন্ন দেশে পাচার করা। কিছুদিন আগে ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি নারীকে নির্যাতনের ভিডিও দু'দেশে ভাইরাল হয়। এর নেপথ্যে হৃদয় বাবু।
যারা কিশোর অপরাধ করছে তারা কারা, কেন তারা অপরাধ করছে? পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের সর্বাধিক সংখ্যক কিশোর অপরাধীর উদ্ভব নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। বিশেষত ডিভোর্সে ভাঙা পরিবার, নেশাগ্রস্ত পরিবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বস্তি পরিবার ও বিবিধ অরক্ষিত পরিবার। এসব পরিবারের শিশুরা আদর্শ নিয়ে বড় হয় না। এরূপ পরিবারের শিশুদের ওপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষীণ। এসব শিশু বিকাশমূলক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অরক্ষিত পরিবারের শিশুরা সহজেই অপরাধমূলক তৎপরতায় লিপ্ত এবং অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তু হয়। নিম্নবিত্ত পরিবারে বাবা-মা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে যান; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার নিজ সন্তানদের সময় দেয় না। শিশুরা বিভিন্ন ধরনের গেম দেখে, সিনেমা দেখে, একাকিত্বে ভোগে এবং অপরাধী হয়ে ওঠে।
সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও প্রযুক্তির প্রসারে শহুরে সংস্কৃতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে গ্রাম-গঞ্জে। আধুনিক সমাজে পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গঠন এবং জীবনযাত্রা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন চর্চার বিষয় ভেঙে যাচ্ছে। ব্যক্তি, সমাজ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে চলছে অনৈতিকতার ছড়াছড়ি। শিশু-কিশোর-তরুণ খুঁজে পাচ্ছে না নৈতিকতার মানদণ্ড। চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিশোররা শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্ব ব্যক্তি, সমাজ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। আর নয় কিশোর অবক্ষয়। জ্ঞানসমৃদ্ধ ও আদর্শিক শিশু-কিশোর হোক ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের যোগ্য উত্তরাধিকারী।
 

সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম
newaz.usso@gmail.com