রোববার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএস টিভিকে সাক্ষাৎকার দেন ফ্রান্সেস হাউগেন। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক বিষয়ে একের পর এক বোমা ফাটানোর মতো অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এই কর্মী। কিন্তু কখনও নিজের পরিচয় সামনে আনেননি। তবে এবার প্রকাশ্যে এসেছেন সেই তথ্যদাতা। এ নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাংবাদিক স্কট পেলি। সিক্সটি মিনিটস অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারের প্রাসঙ্গিক অংশ পত্রস্থ হলো। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক।
স্কট পেলি: আপনি যখন গত মে মাসে ফেসবুক থেকে পদত্যাগ করেন, তখন ফেসবুকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক অভিযোগ করেন। ফেসবুকের গোপনীয় সেসব নথি গত মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় প্রকাশ হয়। কেন আপনি ফেসবুকের গোপন তথ্য প্রকাশ করেছেন?
ফ্রান্সেস হাউগেন: আপনাকে ধন্যবাদ। যে বিষয়টি আমি ফেসবুকে বারবার লক্ষ্য করেছি, সেটা হলো মানুষ ও ফেসবুকের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। ফেসবুক বরাবরই তার নিজের স্বার্থ দেখেছে এবং বেশি অর্থ বানাতে মনোযোগ দিয়েছে।
স্কট পেলি: আপনি যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্য থেকে আসা ৩৭ বছরের একজন তথ্যবিজ্ঞানী। আপনি কম্পিউটার প্রকৌশলে পড়েছেন এবং হার্ভার্ড থেকে ব্যবসায় মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন। গত ১৫ বছর ধরে গুগল পিন্টারেস্টসহ উল্লেখযোগ্য কোম্পানিতে কাজ করেছেন...।
ফ্রান্সেস হাউগেন: আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ফেসবুকেও কাজ করেছি। আপনি নিশ্চয় অনেক সামাজিক নেটওয়ার্ক দেখেছেন। তবে আমি অন্য কোথাও ফেসবুকের মতো এতটা বাজে অবস্থা দেখিনি।
স্কট পেলি: আপনি ফেসবুক থেকে পদত্যাগ করলেন এবং ফেসবুকের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করলেন! আমরা বিস্মিত, আপনি কেন এ অবস্থান গ্রহণ করলেন?
ফ্রান্সেস হাউগেন: :চিন্তা করুন, ফেসবুকের অভ্যন্তরে যা হচ্ছে তা আপনি জানেন এবং বাইরের কেউই এসব জানছে না। আপনি কি মুখ বন্ধ করে রাখবেন? যদি পদত্যাগ না করে আমি ফেসবুকে থাকতাম, তাহলে আমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে কী ঘটবে, তা আমি জানতাম। কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন ব্যক্তির পর ব্যক্তি ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চুপ থেকে এবং নিজেদের কতটা লুকিয়ে রাখতে পারে!
স্কট পেলি: আপনি কখন এবং কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেনথ ফেসবুকের গোপনীয় নথি প্রকাশ করবেন?
ফ্রান্সেস হাউগেন: ২০২১ সালের একটা পর্যায়ে আমি এ সিদ্ধান্ত নিই। আমি উপলব্ধি করি, 'আমাকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে নথিগুলো সরাতে হবে এবং এমনভাবে এটি করতে হবে, যাতে কেউ এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন না করে।'
স্কট পেলি: আপনার একটি নথিতে এটা স্পষ্ট এবং বিভিন্নভাবে তার প্রমাণ রয়েছে- ফেসবুকে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য আছে। বিভক্ত রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ভুল তথ্যও সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যমে রয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে পরিবার ও বিশ্বব্যাপী সমাজের ওপর।
ফ্রান্সেস হাউগেন: যখন আমরা এমন তথ্যের পরিবেশে বাস করি, যেটি ঘৃণা-বিদ্বেষপূর্ণ এবং আধেয় নির্দিষ্ট মেরুকেন্দ্রিক; স্বাভাবিকভাবেই এটি আমাদের নাগরিক আস্থায় চিড় ধরায় এবং একে অপরের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক বিনষ্ট করে। ফেসবুকের বর্তমান যে রূপ আমরা দেখছি, এটি বরং আমাদের সমাজে বিভেদের অশ্রু ঝরায় এবং বিশ্বব্যাপী জাতিগত সহিংসতা ছড়ানোর কারণ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
স্কট পেলি: ২০১৮ সালে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতা হয়। সেখানকার সামরিক বাহিনী গণহত্যা চালাতে ফেসবুক ব্যবহার করে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: এ সহিংসতা ২০১৯ সালের প্রথমদিকে অনুষ্ঠিত হয়।
স্কট পেলি: ফেসবুক বলছে, নাগরিক ঐক্যবদ্ধতার কাজ অন্য ইউনিটকে দেওয়া হয়। হাউগেন, আপনি বলছেন, ফেসবুকের সমস্যার গোড়া ২০১৮ সালে। আপনার নিউজফিডে কী আসবে সেটি যখন ফেসবুক তার বিন্যাস বা এলগরিদম ও প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে ঠিক করে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: এটি আপনিই প্রমাণ করতে পারবেন। যেহেতু আপনার ফোন আছে, আপনি দেখুন। আপনি যদি পাঁচ মিনিট বসেন এবং স্ট্ক্রল করে আপনার নিউজ ফিডে হয়তো ১শ কনটেন্ট (আধেয়) আপনি দেখতে পাবেন। অথচ ফেসবুকের হাজারো অপশন রয়েছে, যেটা তারা আপনাকে দেখাতে পারে।
স্কট পেলি: তার মানে, ফেসবুক বিন্যাস আপনার জন্য ঠিক ওই আধেয়টিই ঠিক করছে, অতীতে আপনি যেসব বিষয়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিলেন।
ফ্রান্সেস হাউগেন: ফেসবুক এমন আধেয় আপনার সামনে হাজির করছে, যেগুলোতে মানুষ অধিকতর যুক্ত কিংবা যেগুলোতে মানুষের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। তবে এটি তার গবেষণায় যেভাবে আধেয় হাজির করছে, তা বিদ্বেষপূর্ণ, বিভেদপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট মেরুর। যার মাধ্যমে মানুষের আবেগ কাজে লাগিয়ে তাকে উস্কে
দেওয়া যায়।
স্কট পেলি: ভুল তথ্য, ক্রোধ-উত্তেজনাকর আধেয় মানুষকে প্ররোচিত করে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: হ্যাঁ। এগুলো অত্যন্ত প্ররোচনাদায়ক।
স্কট পেলি: এবং এগুলোর মাধ্যমেই ফেসবুক মানুষকে ধরে রাখে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: হ্যাঁ। ফেসবুক মনে করছে, তারা যদি নিরাপত্তার জন্য বিন্যাস পরিবর্তন করে দেয়, তাহলে মানুষ কম সময় ফেসবুকে থাকবে এবং কম পরিমাণ বিজ্ঞাপনে ক্লিক করবে। তাতে তাদের অর্থও কম আসবে।
স্কট পেলি: ফেসবুক তাহলে তাদের স্বার্থেই মানবাচরণের খারাপ বিষয়ের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: দুঃখজনকভাবে এটি তার খারাপ ফলগুলোর অন্যতম। আপনি যত আধেয় পছন্দ করছেন বা খাচ্ছেন, ফেসবুক তত বেশি অর্থ পাচ্ছে। মানুষ সেসব আধেয়তেই বেশি যুক্ত হচ্ছে, যেগুলো আবেগীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং অধিক ক্রোধ প্রকাশের কারণ। মানুষের প্রতিক্রিয়া কিংবা যুক্ত হওয়া বৃদ্ধি পাওয়া মানে গ্রাহক সেগুলো খাচ্ছে।
স্কট পেলি: একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাড়ে ১৩ শতাংশ অল্পবয়স্ক তরুণী বলেছে, ইনস্টাগ্রাম আত্মহত্যার চিন্তা উস্কে দিচ্ছে। আর ১৭ শতাংশ বলেছে, ইনস্টাগ্রাম খাবারের রুচি খারাপ করছে।
ফ্রান্সেস হাউগেন: আর দুঃখের বিষয় হলো, ফেসবুকের নিজস্ব গবেষণামতে, এসব তরুণী খারাপ খাবারের ওইসব আধেয়ই বেশি পছন্দ করছে। তারা আরও বেশি পরিমাণে হতাশায় ডুবছে। এবং এসবের প্রতিক্রিয়া তাদেরকে বরং তাদের শরীরের প্রতি আরও ঘৃণা জন্মানোর কাজ করছে। ফেসবুকের নিজস্ব গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইনস্টাগ্রাম টিনএজ তরুণ-তরুণীদের জন্য কেবল ভয়ংকরই নয়, বরং এটি তাদের জন্য অন্য যে কোনো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে ক্ষতিকর।
স্কট পেলি: ফেসবুক এখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। মাত্র ১৭ বছরে এর ২৮০ কোটি ব্যবহারকারী, যেটি ইন্টারনেটে যুক্ত থাকা পৃথিবীর সব মানুষের ৬০ শতাংশ। আপনি এ সপ্তাহেই বিষয়টি কংগ্রেসে উত্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। আপনি কি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিত এ বিষয়ে আইন করা?
ফ্রান্সেস হাউগেন: ফেসবুক বরাবরই এটা দেখিয়েছে, তারা ব্যবহারকারী মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে খেলছে এবং মুনাফা করছে। আমি প্রত্যাশা করি, এটি আইনের আওতায় আসা উচিত।

বিষয় : সাক্ষাৎকার: ফ্রান্সেস হাউগেন

মন্তব্য করুন