মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে 'সাহসী লড়াই'-এ অবদান রাখার জন্য এ বছর যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা ও রাশিয়ার সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। তাদের মধ্যে মারিয়া রেসা যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক এবং অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম র‌্যাপলারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। সম্প্রতি মারিয়া রেসার সঙ্গে কথা বলেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর সুদীপ্ত সাইফুল

এনডিটিভি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সাহসী লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ আপনি ও দিমিত্রি মুরাতভ নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। আপনাদের নোবেলপ্রাপ্তি বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের উজ্জীবিত করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেমন দেখছেন?

মারিয়া রেসা: আমরা এমন একটি সময় পার করছি, যখন অবিশ্বাস্যভাবে মতপ্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে গত কয়েক বছরে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আমি আশাবাদী, ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তেমন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।

এনডিটিভি: মারিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে আপনার লড়াই বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকরা প্রত্যক্ষ করেছেন। নোবেল কমিটি আপনাদের উল্লেখ করেছেন স্বাধীন মতপ্রকাশে সংগ্রামরত সব সাংবাদিকের প্রতিনিধি হিসেবে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

মারিয়া রেসা: আমি মনে করি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে বিশ্বব্যাপী অনেক সাংবাদিক আমার মতো কিংবা দিমিত্রি মুরাতভের মতো বিচলিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা সত্য তথ্য উন্মোচনে সাংবাদিকদের চলমান লড়াইয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। এ স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে- সাংবাদিকদের এ লড়াই চলমান রাখা কতটা কঠিন। সামনের দিনগুলোতে এ স্বীকৃতি সাংবাদিকদের আরও উজ্জীবিত করবে।

এনডিটিভি: কর ফাঁকি, মানহানিকর সংবাদ প্রকাশসহ বিভিন্ন অভিযোগে আপনার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। এমনকি আপনাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। সত্য প্রকাশের দায়ে বিভিন্ন উপায়ে সাধারণ মানুষ, সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সংগঠনের ওপর আক্রমণ করা হয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে তো সত্য বলা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

মারিয়া রেসা: আমরা দেখেছি, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানেও যারা সত্য বলেন, তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়ে থাকে। সেখানে সাংবাদিকদের জবাবদিহি করার চেষ্টা করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনি আক্রমণ করা হয়, যেমনটা আমার সঙ্গে করা হয়েছে। আমার কথাই ধরুন, ফিলিপাইন সরকার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে ১০ বার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। আমাকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হতো আইনজীবীর সঙ্গে। গত বছর আমাকে সাইবার মানহানি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় ২০১২ সালের একটি গল্পের জন্য। অথচ যে গল্পটির জন্য আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, আমি সে গল্পটি লিখিনি, সম্পাদনা করিনি কিংবা তত্ত্বাবধানও করিনি। এটা এমন একটি সময় যখন ক্ষমতাবানরা তাদের ক্ষমতা সুদৃঢ় করেছে; সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, যা মূলত মানুষের বিশ্বাসে পরিবর্তন আনছে। সাংবাদিকরা এখন নানা উপায়ে টিকে আছে মাত্র। আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততা হুমকির মুখে পড়েছে। সুতরাং প্রশ্নটা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার। আমার ধারণা, নোবেল কমিটি এটা বলতে চেয়েছে- যেখানে তথ্য নেই সেখানে সত্য নেই। আর সত্য ছাড়া বিশ্বাস আসতে পারে না। এগুলোর মধ্যে যদি কোনোটির ঘাটতি থাকে তাহলে গণতন্ত্র কার্যকর থাকতে পারে না।

এনডিটিভি: শান্তি ও গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বব্যাপী লড়াই চলছে। আপনি ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা অবশ্যই ব্যক্তিগত কারণে নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন কেউ আপনার মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাকে 'রাষ্ট্রবিরোধী' আখ্যা দেওয়া হয়। ভারতে এ কথাটি বেশি শোনা যায়...

মারিয়া রেসা: ঠিক বলেছেন। ক্ষমতা ধরে রাখতে এটাকে সাংবাদিকদের ঘায়েল করার উপায় হিসেবে ক্ষমতাবানরা ব্যবহার করে থাকে। আমরা মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছি, আর তারা আমাদের রাষ্ট্রবিরোধী বলছে। প্রেসিডেন্ট দুতার্তের কথাই ধরুন। তিনি বললেন, র‌্যাপলারের মালিক একজন আমেরিকান, যা সত্য নয়। কিন্তু যখন এটা রাষ্ট্রপতির মুখ থেকে বের হয়, তখন তো অনেকেই বিশ্বাস করবে। আপনি যখন কোনো বিতর্কিত বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেন, তখন জবাবদিহিতার পরিবর্তে সরকার আপনাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়।

এনডিটিভি: আপনার কাছ থেকে বিশেষ কিছু জানতে চাই, বিশেষ করে গত ৫-৬ বছরে আপনার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা। আপনি মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছিলেন। ওই সময় কি অন্য কিছু করার চিন্তা করেছিলেন?

মারিয়া রেসা: একেবারেই না। অন্য কোনো চিন্তা করার অবকাশ ছিল না। র‌্যাপলার যখন সরকারের রোষানলে পড়ে, তখন আমি প্রায় বৃদ্ধ। আমি সাংবাদিকতা করছি প্রায় তিন যুগ ধরে। যখন আমরা সরকারের রোষানলে পড়ি তার আগেই আমি এবং আমার সহ-প্রতিষ্ঠাতা বুঝতে পেরেছি, আমরা কী করছি এবং কেন করছি। আমরা সাংবাদিকতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানতাম। সুতরাং এটা খুবই অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় যে, সরকার আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করবে; আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার চেষ্টা করবে কিংবা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবে আর আমরা পালিয়ে যাব। আমরা বরং সরকারের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। আর আমরা এটাই উপলব্ধি করছি যে, সাংবাদিকতার লক্ষ্য অর্জন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ জানুয়ারি সরকার লাইসেন্স বাতিলের মাধ্যমে র‌্যাপলার বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আমরা তখন আদালতের শরণাপন্ন হই। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখি। র‌্যাপলার একটি ছোট সংবাদ সংস্থা। আমি এ প্রতিষ্ঠানকে একটি বাস্তব মিশন দিয়েছি, যা এটিকে চলমান রেখেছে। আমরা বাধ্য হয়ে এ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। এখন আমরা ২০২২ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটা প্রেসিডেন্ট দুতার্তের ছয় বছর শাসনামল সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। আমি মনে করি, আমরা এমন একটি সময়ে উপনীত হয়েছি যখন আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে- আমরা গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখব। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নিতে এবং আমাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব।